বাংলাদেশে রপ্তানি বন্ধ লিচুর, বাজার হারিয়ে চরম সঙ্কটে চাষিরা, রাতের ঘুম উধাও

বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক তিক্ততা এবং সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সরাসরি ও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর লিচু চাষিদের জীবনে। পহেলগাম হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে দেশের মানুষের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং সামগ্রিকভাবে পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক আবহে রাতারাতি ঐতিহ্যবাহী লিচু বাজার হারিয়ে চরম সঙ্কটে পড়েছেন এখানকার লিচু চাষিরা। এমনিতেই আবহাওয়াজনিত কারণে এ বছর লিচুর ফলন কম হয়েছে, তার উপর এই বাজার হারানোয় তাদের রাতের ঘুম উধাও হয়েছে। কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবেন, তা বুঝেই উঠতে পারছেন না তারা।

পূর্বস্থলীর লিচুর, বিশেষ করে মিষ্টি ও রসালো ‘বোম্বাই লিচু’-র চাহিদা রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। এই লিচুর সবচেয়ে বড় বাজার ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে। এছাড়াও সৌদি আরব এবং কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতেও পূর্বস্থলীর বোম্বাই লিচু রপ্তানি হতো। কিন্তু লিচু বাজারে ওঠার ঠিক মুখেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে যে ধরনের রাজনৈতিক জটিলতা বা তিক্ততা তৈরি হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে তীব্র জনমত তৈরি হয়েছে, তার জেরে পূর্বস্থলীর লিচু রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়ে যাওয়ায় এখানকার চাষিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। বাধ্য হয়েই এখন তাদের উৎপাদিত লিচু স্থানীয় বাজারে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এমনিতেই আবহাওয়াজনিত কারণে এ বছর লিচুর ফলন তুলনামূলকভাবে বেশ কম হয়েছে। তার উপর এই বাজার হারানোয় চাষের খরচ বাবদ বিনিয়োগ আদৌ উঠবে কিনা, তা নিয়েও চরম দোলাচলে রয়েছেন তারা। এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সামনেই বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি’র পূর্বাভাস। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় শঙ্কিত রয়েছেন চাষিরা, কারণ এর প্রভাব পড়লে লিচুর মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

পূর্বস্থলীর ফলেয়া–সহ বেশ কিছু এলাকায় বিঘের পর বিঘে জমি জুড়ে লিচুর বাগান রয়েছে। এখানে মূলত দু’রকমের লিচুর চাষ হয় – একটি ছোট আঁটির লিচু এবং অন্যটি পুরোটাই শাঁসে ভরা সুগন্ধী বোম্বাই লিচু। এই বোম্বাই লিচুই মূলত বিদেশের বাজারে উচ্চমূল্যে রপ্তানি হয়।

ফলেয়ার লিচু চাষি হাসান শেখ তার সমস্যার কথা জানিয়ে বলেন, “আমাদের এক বিঘা জমিতে প্রায় ২০টি করে লিচুর গাছ থাকে। তাতে ফলন ভালো হলে ৬০ থেকে ৬৫ হাজারের মতো লিচু পাওয়া যায়। একটি লিচু গাছের পরিচর্যার জন্য সার, কীটনাশক, শ্রমিক খরচ মিলিয়ে কমপক্ষে সাত থেকে আট হাজার টাকা খরচ হয়। বিশেষ ভাবে এই গাছের যত্ন নিতে হয়।” তিনি জানান, এজেন্টদের মাধ্যমে এখান থেকে বোম্বাই লিচু প্রথমে বাংলাদেশে যেত, তারপর সেখান থেকে সৌদি আরব বা কাতারে পাঠানো হতো। কিন্তু এবার পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে যাওয়ায় এজেন্টদের পক্ষেও লিচু বিদেশে পাঠানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনটা হতে পারে, তা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।”

বাজারদর নিয়ে হাসান শেখ জানান, বোম্বাই লিচু যখন বিদেশে পাড়ি দিত, তখন এক হাজার পিস লিচুর দর তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যেত। কিন্তু এই মুহূর্তে সেই সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যাওয়ায় চাষিরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজারে সেই লিচু এক হাজার পিস মাত্র দু’হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন। এতে তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

আর এক লিচু চাষি আব্দুল হান্নান শেখ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আবহাওয়াজনিত কারণে এ বার লিচুর ফলনও বেশ কম হয়েছে। ফলন ভালো হলে হয়তো কিছুটা লাভের মুখ দেখা যেত। কিন্তু বাজার একেবারেই উঠছে না। সামনেই জামাইষষ্ঠী আছে। তখন হয়তো বাজারের দর একটু ভালো থাকে, সেই দিকেই এখন আমরা তাকিয়ে রয়েছি।” তবে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস নিয়ে তার উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, “জামাইষষ্ঠীর আগেই ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস রয়েছে। তার প্রভাব যদি এখানে পড়ে, তা হলে প্রবল ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। গাছ থেকে কাঁচা লিচু ঝরে যাবে বা পেকে গেলেও বিক্রি করার সুযোগ থাকবে না। এই পরিস্থিতিতে আমাদের ভবিষ্যৎ ঘোর অনিশ্চিত।” সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং প্রকৃতির সম্ভাব্য রোষ চাষিদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।