কেন বারবার সিপিএমকে গালিগালাজ করছেন শুভেন্দু? দুই দলের দু’রকম তথ্যে সরগরম

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের এক সময়ের অন্যতম প্রধান মুখ এবং বর্তমানে বিজেপির রাজ্য বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর সিপিএম বিরোধিতা একটি বহুচর্চিত বিষয়। ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের আগে থেকে শুরু করে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী সিপিএমকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা— সব সময়েই তিনি বামফ্রন্ট, বিশেষ করে সিপিএমের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই ধারা বজায় ছিল। এরপর সিপিএম রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে বিজেপি রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসাবে উঠে আসে এবং শুভেন্দু অধিকারী নিজেও তৃণমূল ছেড়ে সেই দলে যোগ দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজ্য-রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় এবং নিজে বিরোধী দলনেতা হওয়ার পরও কেন তিনি এখনও সিপিএমকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে চলেছেন? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
অতীতে শুভেন্দু অধিকারীর সিপিএমকে আক্রমণ করার মূল কারণ ছিল দুটি: এক, সিপিএমকে পরাজিত করে রাজ্যের ক্ষমতা দখল করা এবং দুই, ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী সিপিএমকে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন সিপিএম রাজ্যের মূল বিরোধী শক্তি নয়, সেই জায়গায় উঠে এসেছে বিজেপি। এমতাবস্থায় শুভেন্দু অধিকারীর সিপিএম আক্রমণের নেপথ্যে অন্য কারণ দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনায় শুভেন্দু অধিকারীর সিপিএম বিরোধী এই মনোভাব আবার স্পষ্ট হয়েছে। মুর্শিদাবাদের হিংসায় নিহত হরগোবিন্দ দাস এবং চন্দন দাসকে সিপিএম তাদের কর্মী দাবি করলেও, শুভেন্দু অধিকারী তাঁদের ‘হিন্দু’ পরিচয়কে বড় করে সামনে এনে বলেছিলেন যে তাঁরা হিন্দু বলেই খুন হয়েছেন। আবার, কৃষকসভার নেতৃত্বে সিপিএমের ব্রিগেড সমাবেশে অনেকের দাবি অনুযায়ী ভালো ভিড় হলেও, শুভেন্দু অধিকারী সেই সমাবেশকে ‘ফাঁকা মাঠ’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন এবং হিন্দু জনতাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন ওই সভায় যোগ না দেওয়ার জন্য। এমনকি, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাশে থেকেও কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করায় সিপিএমের দৈনিক মুখপত্র ‘গণশক্তি’ সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন তিনি, বলেছিলেন যে ওই কাগজ ঝালমুড়ির ঠোঙা বা পোষ্যের বিষ্ঠা পরিষ্কার করা ছাড়া অন্য কোনো কাজে লাগে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে শুভেন্দু অধিকারীর সিপিএমকে আক্রমণ করার পিছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, সিপিএম পশ্চিমবঙ্গে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে পরিচিত। শুভেন্দু অধিকারী সম্ভবত এই ভাবমূর্তি ভাঙতে চাইছেন, যা মেরুকরণের মাধ্যমে বিজেপির হিন্দু ভোটব্যাংক বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে রাজ্য-রাজনীতিতে সিপিএমের শক্তি কম হলেও, ধীরে ধীরে তারা বিজেপির দিকে চলে যাওয়া তাদের পুরনো ভোটব্যাংক কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই প্রবণতা ঠেকাতে এবং বিজেপির ভোট অক্ষুণ্ন রাখতে সিপিএমকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করা ছাড়া অন্য উপায় নেই।
এই ধরণের আক্রমণের মূল কারণ হিসেবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে। সিপিএমের ভোটব্যাংক থেকে হিন্দু ভোট বিজেপির দিকে টানতে পারলে তৃণমূল কংগ্রেসকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেওয়া সম্ভব হবে বলে বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে। পাশাপাশি, সিপিএম যাতে বিরোধী দল হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, তার জন্যও শুভেন্দু অধিকারী বামেদের বিরুদ্ধে লাগাতার আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছেন। এরই অংশ হিসাবে তিনি বামেদের বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করে বলেছেন যে, “২০২৬ সালের পর যাদবপুর থেকে দেশবিরোধী শক্তিকে চুলের মুঠি ধরে পিটিয়ে বের করে এনে ড্রোনে বেঁধে পাকিস্তানে ফেলে আসা হবে।”
এই বিষয়ে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন যে, যারা সিপিএমের ব্রিগেডে গিয়েছিলেন, সেই গ্রামীণ জনতার ৭০ শতাংশই শেষ পর্যন্ত বিজেপিকেই ভোট দেবেন কারণ তারা তৃণমূলকে হারাতে বিজেপিকেই একমাত্র সক্ষম মনে করেন। অন্যদিকে, সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম শুভেন্দু অধিকারীর এই কৌশলকে কটাক্ষ করে বলেছেন, “বিজেপি হিন্দু হিন্দু ভাই–ভাই স্লোগান দিচ্ছে। শুভেন্দু হিন্দু সম্রাট হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিজেপির ভিতরেই হিন্দুরা এক হয়ে থাকতে পারছেন না।” সব মিলিয়ে, শুভেন্দু অধিকারীর সিপিএম আক্রমণ বর্তমানে রাজ্য-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।