বাবা নেয়, চাষের কাজের ফাঁকে পড়াশোনা, সাহেবডাঙার দুই বীরাঙ্গনা, উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম সাফল্য

শান্তিনিকেতনের অদূরে অবস্থিত আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম সাহেবডাঙা যেন এতদিন ছিল উন্নয়নের আলো থেকে বহু দূরে। কংকালীতলা গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন এই গ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়ি এখনও কাঁচা, পর্যাপ্ত পানীয় জলের অভাব প্রকট এবং ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটই এখানকার পরিচিত ছবি। প্রায় ৪৬টি পরিবারের বাস হলেও গ্রামে নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভরসা কেবল একটি শিশুশিক্ষা কেন্দ্র। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও এই গ্রাম থেকে প্রথমবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে দুই ছাত্রী – সুমিত্রা টুডু এবং বাসন্তী টুডু। শুধু উচ্চমাধ্যমিক নয়, এর আগে এই গ্রামের প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হিসেবেও নজির গড়েছিল এই দুই কন্যেই।
সুমিত্রা ও বাসন্তীর জীবন সংগ্রামময়। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছে তারা। এরপর মায়ের সঙ্গেই নেমে পড়তে হয়েছে জীবনযুদ্ধে। অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে তারা – ধান পোঁতা থেকে ধান কাটা, সব কাজই তারা করে মায়ের সঙ্গে। এই কঠিন পরিশ্রমের মাঝেই চালিয়ে গেছে পড়াশোনা। নিজেদের লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে আজও তাদের গলা ধরে আসে, চোখে জল চলে আসে।
তবে তাদের এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি পুরো সাহেবডাঙা গ্রামের জন্য এক নতুন দিশা। সুমিত্রা ও বাসন্তীকে দেখে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরে প্রায় ৬০ জন শিশু ও কিশোর-কিশোরী এখন নিয়মিত পড়াশোনা করছে। এই দুই কৃতী ছাত্রীর অন্যতম লক্ষ্য হলো গ্রামে বাল্যবিবাহের মতো অভিশাপ দূর করা এবং শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, পড়াশোনা করলেই নতুন প্রজন্ম স্বনির্ভর হতে পারবে এবং সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
তাদের এই অসাধ্য সাধনে নেপথ্যের কারিগর শিক্ষক বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল। বোলপুরের রজতপুর গ্রামের বাসিন্দা হয়েও তিনি নিজের বাড়ি থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সাহেবডাঙা গ্রামে এসেছেন দিনের পর দিন, সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে এখানকার ছেলেমেয়েদের পড়ানোর জন্য। আজ গ্রামবাসীরা তাঁর অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।
শিক্ষক বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল জানান, সুমিত্রা ও বাসন্তী চরম কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছে। কোনো সরকারি সাহায্য ছাড়াই মাঠে কাজ করে তারা পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। গ্রামের প্রথম মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হিসেবে তাদের সাফল্যে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বাসন্তী টুডু পেয়েছে ২২৯ নম্বর এবং সুমিত্রা টুডু পেয়েছে ২১৯ নম্বর। দু’জনের মায়ের নামই লক্ষ্মী টুডু। মেয়ের এই সাফল্যে তাদের চোখে আনন্দাশ্রু। তাঁরা জানান, বহু কষ্ট করে মেয়েকে বড় করেছেন এবং আজ তারা গর্বিত।
গ্রামবাসী তালাবু বাস্কি বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েরা বাবাকে হারানো সত্ত্বেও দিনমজুরের কাজ করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। তাদের সাফল্যে গোটা গ্রাম খুশি এবং অনুপ্রাণিত। তিনি বিশেষভাবে শিক্ষক বুদ্ধিশ্বর মণ্ডলের অবদানের কথা উল্লেখ করেন।
যদিও এই বীরভূম জেলাতেই রয়েছে বিশ্বভারতী, বিশ্ববাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও সংস্কৃতির পীঠস্থান বোলপুর-শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সাহেবডাঙা গ্রামে শিক্ষার আলো পৌঁছতে এত বছর লেগে গেল, আর তা সম্ভব হলো সুমিত্রা ও বাসন্তীর হাত ধরে – যা এক বিরল নজির। এত বড় সাফল্যের পরেও প্রশাসনিক বা কর্পোরেট স্তরে এই ছাত্রীদের নিয়ে কোনো বিশেষ মাতামাতি লক্ষ্য করা যায়নি।