‘পিকচার আভি বাকি হ্যায়’ ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট প্রাক্তন সেনা প্রধানের, পাক গুলিতে শহিদ ৩ ভারতীয়!

‘মারের বদলা পাল্টা মার’। জম্মু কাশ্মীরের পহলেগাঁওয়ে নিরীহ পর্যটকদের উপর জঙ্গি হামলার পর এই একটাই দাবি উঠেছিল আসমুদ্র হিমাচল জুড়ে ফুঁসে ওঠা দেশবাসীর কাছ থেকে। মঙ্গলবার মধ্যরাতে সেই বদলা নিয়ে দেখাল ভারত। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে এক অতর্কিত ও পরিকল্পিত অভিযানে একযোগে তিন বাহিনী মিসাইল হামলা চালালো পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে অবস্থিত একাধিক জঙ্গিঘাঁটিতে। গুঁড়িয়ে দেওয়া হল সন্ত্রাসবাদের কালো হাত। এই সাফল্যে দেশজুড়ে যখন উৎসবের আমেজ, ঠিক তখনই ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরভানের একটি চাঞ্চল্যকর পোস্টে নতুন করে শোরগোল পড়েছে – তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ‘অভি পিকচার বাকি হ্যায়…’। যদিও এই অভিযান চলাকালীন পাকিস্তানি সেনার পাল্টা গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে।
পহেলগাঁওয়ের বর্বরতা ও ‘মোদিকে গিয়ে জানিও’ চ্যালেঞ্জ
গত ২২ এপ্রিল জম্মু কাশ্মীরের পহলেগাঁওয়ে হিন্দু পর্যটকদের উপর যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, তার ১৫ দিনের ব্যবধানে যোগ্য প্রতিশোধ নিল ভারত। এই হামলার পর থেকেই গোটা দেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল এবং কঠোরতম পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না। বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি পহেলগাঁওয়ের হামলাকে ‘অতিবর্বরতা’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, হামলার সময় জঙ্গিরা নাকি স্পর্ধা দেখিয়ে বলেছিল, “মোদিকে গিয়ে জানিয়ো”। তিনি মনে করিয়ে দেন, এই হামলা ছিল সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়াতে এবং ধর্ম জেনে পর্যটকদের খুন করার একটি ঘৃণ্য কাজ। এছাড়াও, জম্মু-কাশ্মীর যখন বিকাশের পথে ফিরছিল এবং পর্যটন থেকে কাশ্মীরিরা স্বনির্ভর হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয় ভারতের উন্নয়নের গতি স্তব্ধ করতে।
২৩ এপ্রিল সিদ্ধান্তের পর মধ্যরাতে হামলা
বিদেশ সচিব জানান, ২৩ এপ্রিলই পহেলগাঁও হামলার প্রত্যাঘাতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং সমস্ত তথ্য জোগাড় করেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বারবার ভারতে হামলা হতে থাকে, তাই পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, এর আগেও সন্ত্রাসের শিকার ৩৫০-র বেশি ভারতীয় নাগরিক। পহেলগাঁওয়ে হামলা চালানো লস্কর-ই-তৈবার শাখা TRF ছিল। স্পষ্ট হয়ে গেছে যে জঙ্গিদের আশ্রয় দেয় পাকিস্তান। তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন, মুম্বই হামলার পর সবচেয়ে বড় হামলা ছিল পহেলগাও হামলা।
বায়ুসেনার নির্ভুল নিশানায় গুঁড়িয়ে গেল জইশ-লস্কর-হিজবুলের ঘাঁটি
এই ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আওতায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী মঙ্গলবার মধ্যরাতে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মোট ৯টি জঙ্গি ঘাঁটিকে নিশানা করে। একযোগে স্থল, নৌ এবং বায়ুসেনা মিসাইল হামলা চালালো বলে খবর। বিশেষ করে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে অবস্থিত জঙ্গি ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ভারতীয় বায়ুসেনা রাফাল যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে।
এই অভিযানে ধ্বংস হওয়া ঘাঁটিগুলির মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের বাহাওয়ালপুরের ২টি জায়গা, মুরিদকে এবং শিয়ালকোট। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মুজফ্ফরাবাদ, কোটলি এবং ভীমবের। এছাড়াও গুলপুর ও চক আমরুতে জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। এই ঘাঁটিগুলির মধ্যে বাহাওয়ালপুরে জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটি, মুরিদকেতে লস্কর-ই-তৈবার ঘাঁটি, সারজালে জইশ ঘাঁটি, শিয়ালকোটে হিজবুল মুজাহিদিনের ঘাঁটি, বারনালায় লস্করের ঘাঁটি, কোটলিতে জইশ ও হিজবুলের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মুজফ্ফরাবাদে লস্কর ও জইশের প্রশিক্ষণ শিবির বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
৯০০ জঙ্গি অবস্থান করছিল ঘাঁটিতে, আনুষ্ঠানিক সংখ্যার অপেক্ষা
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, হামলার আগে এই ৯টি ঘাঁটিগুলোতে প্রায় ৯০০ জঙ্গি অবস্থান করছিল। এর মধ্যে বাহাওয়ালপুরের ঘাঁটিতে ২৫০ জন, মুরিদকেতে ১২০ জন, মুজাফফরাবাদ ও কোটলিতে প্রায় ২০০ জন এবং শিয়ালকোট, গুলপুর, ভীমবের ও চক আমরুর ঘাঁটিগুলোতে হামলার সময় ৩০০ জনের বেশি জঙ্গি ছিল। যদিও এই ঘাঁটিগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে খবর, তবে অপারেশন সিঁদুরে ঠিক কতজন জঙ্গি হতাহত হয়েছে, সে বিষয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সূত্র প্রাথমিক ভাবে ৫০ জন জঙ্গি নিহতের খবর দিলেও সরকারিভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি।
সংযম দেখিয়েছে ভারত, টার্গেট শুধু জঙ্গি পরিকাঠামো
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই বিবৃতি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছে, “ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনো পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করেনি। লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হামলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংযম বজায় রাখা হয়েছে। কেবলমাত্র সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোকেই নিশানা করা হয়েছে।” ভারত এই প্রত্যাঘাত নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন অজিত ডোভাল। এছাড়াও রাশিয়া, ব্রিটেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীকেও এই বিষয়টি জানানো হয়েছে ভারতের তরফে।
পাক সেনার গুলিবর্ষণে শহিদ ৩ ভারতীয় নাগরিক
তবে ভারতের এই অভিযানের পরই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে। এই পাক সেনার নির্বিচার গুলিতে পুঞ্চ অঞ্চলে ৩ জন ভারতীয় নাগরিক শহিদ হয়েছেন এবং কয়েকজন আহতও হয়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ভারতীয় সেনা পাল্টা যোগ্য জবাব দিয়েছে। এদিকে, ভারতের হামলা স্বীকার করে নেওয়া পাকিস্তান দাবি করেছে, ভারত ৬টি স্থানে ২৪টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’ হামলায় ৮ জন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ভারতের এই প্রত্যাঘাতের কথা স্বীকার করেছেন।
প্রাক্তন সেনাপ্রধান বললেন ‘পিকচার আভি বাকি হ্যায়…’
পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব দেওয়ায় দেশজুড়ে যখন উৎসবের আমেজ, ঠিক তখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরভানের একটি পোস্টে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। তিনি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে ”অপারেশন সিঁদুর” নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লেখেন, ”অভি পিকচার বাকি হ্যায়…”। এই মন্তব্যের মাধ্যমে প্রাক্তন সেনাপ্রধান ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যদি পাকিস্তান ভারতে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করে সংঘাত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এই ধরনের আরও আক্রমণ ভবিষ্যতে হবে।
রাজনৈতিক ও তারকা মহলের প্রশংসা, প্রধানমন্ত্রীর নজরদারি
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর বাসভবনে বসেই গোটা অপারেশনে নজরদারি চালান। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং স্থল, নৌ এবং বায়ু সেনা, তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে কথা বলেন। ভারতীয় সেনাও তাদের এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে লিখেছে, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জয় হিন্দ’। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বিরোধী দলের নেতারা এবং চলচ্চিত্র জগতের তারকারাও ভারতীয় সেনার এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং সেনার প্রতি গর্ব প্রকাশ করেছেন। তবে ‘অপারেশন সিঁদুর’ ঘিরে ভুয়ো ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনী সকাল ১০টায় এই প্রত্যাঘাত নিয়ে একটি প্রেস ব্রিফিং করে বিশদে জানিয়েছে।
পহেলগাঁও হামলার পর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে দ্রুত পাল্টা জবাব দিয়ে ভারত বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে যে তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত এবং মারের বদলা নিতে তারা অনড়। এই অভিযানে জঙ্গি পরিকাঠামোর বড়সড় ক্ষতি হয়েছে এবং পাকিস্তানের মাটিতে সন্ত্রাসবাদের কালো হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন সেনাপ্রধানের মন্তব্য সেই কঠোর বার্তারই পুনরাবৃত্তি করছে। তবে পাকিস্তানি সেনার কাপুরুষোচিত গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু ঘটনার অন্য একটি দুঃখজনক দিক। এই ঘটনার পর নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।