কাশ্মীরে সেনার ফোন হ্যাকে এপিটি-৩৬ গ্রুপের ছক ফাঁস, AI ও ফিশিং অ্যাটাকের ফাঁদ পেতেছে জঙ্গিরা!

সাম্প্রতিক অভিযানগুলির পর ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীর নিয়ে কী কৌশল গ্রহণ করছে, তা জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান। বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করেও ভারতের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কৌশল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে না পেরে এবার তারা সাইবার জগৎকে হাতিয়ার করেছে। ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা সম্প্রতি পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের (ISI) এমনই এক মারাত্মক সাইবার কৌশলের পর্দাফাঁস করেছেন, যা ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিষয়ে দেশের সুরক্ষায় নিযুক্ত সমস্ত সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্ক করা হয়েছে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, কাশ্মীর নিয়ে ভারতীয় সেনার অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য জোগাড় করতে পাকিস্তান বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এজন্য তারা অত্যাধুনিক সাইবার পন্থা অবলম্বন করেছে এবং এই কাজে ‘ওজিডব্লিউ’ (Over Ground Worker) বা স্থানীয় সহায়তাকারীদের ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইএসআই।
কী ছক নেওয়া হয়েছে?
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই কাজে মূলত দু’ধরণের পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ভারতীয় নেতাদের গলার স্বর নকল করে ভুয়ো ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে। এই ভিডিওগুলো সোশ্যাল মিডিয়া সহ বিভিন্ন মাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করার ছক রয়েছে, যাতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে এবং তাদের মনোবল ভেঙে যায়।
দ্বিতীয় এবং আরও সরাসরি পদ্ধতিটি হলো, ভারতীয় সেনাবাহিনীর পদাধিকারী এবং জওয়ানদের ওপর সরাসরি ‘ফিশিং অ্যাটাক’ চালানো। এর জন্য অত্যন্ত প্রফেশনাল পদ্ধতিতে ভুয়ো লিঙ্ক তৈরি করে তার সঙ্গে ক্ষতিকারক অ্যাটাচমেন্ট যুক্ত করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের নজরে বেশ কয়েকটি সন্দেহজনক ইউআরএল (URL) এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো এপিটি–৩৬ (APT–36), যা পাকিস্তান থেকে নিয়ন্ত্রিত একটি কুখ্যাত হ্যাকার গ্রুপ।
এই হ্যাকার গ্রুপটির পক্ষ থেকে যে অ্যাটাচমেন্টগুলি তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোর নাম অত্যন্ত প্রলুব্ধকর এবং প্রাসঙ্গিক। যেমন ‘রিপোর্ট আপডেট রিগার্ডিং পহেলগাম টেরর অ্যাটাক’ বা ‘কাশ্মীর অ্যাটাক লেটেস্ট’। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, যে ডোমেনের মাধ্যমে এই অ্যাটাচমেন্ট তৈরি করা হয়েছে তা ভারতীয় সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি, যেমন ‘জে অ্যান্ড কে পুলিশ ডট জিওভি ডট ইন’ (j&kpolice.gov.in)। আরেকটি ক্ষেত্রে ‘মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্স ডট ওআরজি’ (ministryofdefence.org) এর নামে লিঙ্ক তৈরি করা হয়েছে এবং তার সঙ্গে সরকারি এসওপি (Standard Operating Procedure) সম্পর্কিত অ্যাটাচমেন্ট যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও ‘আর্জেন্ট টেকনিক্যাল মিটিং নোটিস’ (Urgent Technical Meeting Notice) এর মতো জরুরি বিষয় ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে হ্যাকাররা আসল ডোমেনের সাব ডোমেন ব্যবহার করে সেনা অফিসারদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে।
ওজিডব্লিউদের ব্যবহার ও বিপদ:
গোয়েন্দা কর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে এই লিঙ্কগুলোর নাম দেখে সেগুলি ভারত সরকারের বৈধ সাইট বা ফাইল মনে হলেও আসলে তা নয়। কেউ একবার কৌতুহলী হয়ে সেই লিঙ্কে ক্লিক করলেই তার মোবাইল বা কম্পিউটারের সমস্ত গোপনীয় তথ্য সরাসরি পাক–হ্যাকারদের হাতে চলে যাবে। গোয়েন্দা কর্তার বক্তব্য, যেহেতু সেনাবাহিনীর লোকেদের সরাসরি ফোন নম্বর পাক–হ্যাকারদের কাছে নেই, তাই তারা এই কাজে স্থানীয় স্তরে ওজিডব্লিউদের ব্যবহার করতে চাইছে। ওই স্থানীয় যুবকরা যদি এই ভুয়ো লিঙ্কগুলো ব্যাপকভাবে সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্যান্য মাধ্যমে শেয়ার করতে থাকে, তাহলে কোনো না কোনো ভাবে সেগুলো বাহিনীর সদস্যদের কাছেও ফরোওয়ার্ড হয়ে চলে যেতে পারে। এইভাবেই একটি ফাঁদ তৈরি করে তারা অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য পেতে চাইছে। গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এখনও পর্যন্ত এপিটি–৩৬ এর পক্ষ থেকে মোট ৯টি বিভিন্ন ধরনের অ্যাটাচমেন্ট তৈরি করা হয়েছে। ফলে, সেনা বাহিনীর লোকেরা তাঁদের ফোনে আসা অচেনা বা সন্দেহজনক লিঙ্কে একবার ক্লিক করে ফেললে মোবাইল হ্যাক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
সতর্কতা ও তদন্ত:
এমতাবস্থায়, দেশের সুরক্ষার স্বার্থে বাহিনীর লোকেদের তাঁদের ফোনে আসা অচেনা, অজানা লিঙ্কে বা অ্যাটাচমেন্টে ক্লিক না করার জন্য কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্তের জন্য সন্দেহভাজন আইপি অ্যাড্রেসগুলি তদন্তকারী সংস্থাকে জানানো হয়েছে। সাইবার বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, কেউ না জেনে এ সব লিঙ্কে ক্লিক করলে তার ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে এবং পরবর্তীতে রেপুটেশন নষ্ট করার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেলও করা হতে পারে। সুতরাং, এই বিষয়ে চরম সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো ভাবে সরাসরি পেরে না ওঠায় পাকিস্তান এখন সাইবার স্পেসের মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে এই ধরনের ‘ডার্টি গেম’ খেলতে নেমেছে। এই সাইবার হামলা রুখতে দেশের সমস্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।