“পাকিস্তানকে ‘ভাতে মারার’ কৌশল”-জারি তিন দফা নিষেধাজ্ঞা, ভারতের চাপে কাঁদছে পাক সরকার

জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করছে ভারত। সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি এবার পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে ‘ভাতে মারার’ কৌশল নিয়েছে দিল্লি, এমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। শনিবার পাকিস্তানের উপর যে নতুন তিন দফা নিষেধাজ্ঞা চাপানোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে, তাকে সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ঠিক কী সেই নিষেধাজ্ঞা?

ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রক ২ মে এক বিবৃতি জারি করে পাকিস্তানের উপর এই নয়া নিষেধাজ্ঞাগুলি ঘোষণা করেছে, যা শনিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। নিষেধাজ্ঞাগুলি হলো:

১. বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা: পাকিস্তান থেকে সরাসরি বা অন্য কোনো দেশ (যেমন দুবাই) হয়ে ঘুরপথে যে কোনো ধরনের পণ্য আমদানির উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২. ডাক নিষেধাজ্ঞা: পাকিস্তান থেকে ডাকযোগে আসা সব ধরনের চিঠিপত্র এবং পার্সেলের উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। ৩. শিপিং নিষেধাজ্ঞা: পাকিস্তানের পতাকাবাহী কোনো জাহাজকে ভারতের কোনো বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দেওয়া হবে না। একইভাবে, ভারতের কোনো জাহাজও পাকিস্তানের বন্দরে যাবে না।

পহেলগাম পরবর্তী পদক্ষেপ ও প্রধানমন্ত্রীর বার্তা

গত ২২ এপ্রিল পহেলগামে জঙ্গিহামলায় পাকিস্তানি যোগসূত্র সামনে আসার পরই পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে ভারত। সীমান্ত বন্ধ, পাক ভিসা বাতিল এবং সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করার মতো কড়া পদক্ষেপ আগেই নেওয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় এই নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলি এল।

এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শনিবারও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আঙ্গোলার প্রেসিডেন্টকে পাশে বসিয়ে পাকিস্তানকে প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জঙ্গি এবং সন্ত্রাসের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে আমরা বদ্ধপরিকর। সন্ত্রাস মানবতার জন্য বড়সড় বিপদ, তা সমূলে বিনাশ করা প্রয়োজন।’ সরাসরি পাকিস্তানের নাম না করলেও ‘সন্ত্রাসের মদতদাতা’ বলতে যে প্রতিবেশীকেই বোঝানো হয়েছে, তা রাজনৈতিক মহলে স্পষ্ট। আর সেই মদতদাতাকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতেই শনিবারের নয়া তিন নিষেধাজ্ঞা বলে মনে করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি: পাকিস্তানেরই ভারত-নির্ভরতা বেশি

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নয়া নিষেধাজ্ঞাগুলি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে আঘাত হানতে পারে। এমনিতে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সরাসরি আমদানি বাণিজ্য খুবই নগণ্য। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১–২২ সালে পাকিস্তান থেকে ভারতের আমদানি বাণিজ্য হয়েছিল মাত্র ২৫.৪ লক্ষ ডলারের, যেখানে ভারত পাকিস্তানে রপ্তানি করেছিল প্রায় ৫২ কোটি ডলারের পণ্য। ২০২২–২৩ অর্থবর্ষেও পাকিস্তানের আমদানি ছিল ২.০১ কোটি ডলারের বিপরীতে ভারতের রপ্তানি ছিল প্রায় ৬৩ কোটি ডলারের। সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান (এপ্রিল ২০২৪-জানুয়ারি ২০২৫) অনুযায়ীও পাকিস্তান থেকে ভারতের আমদানির অর্থমূল্য ছিল মাত্র ৪.২ লক্ষ ডলার, যেখানে ভারত থেকে পাকিস্তানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি ডলারের সামগ্রী।

অর্থাৎ, বাণিজ্যিক লেনদেনে পাকিস্তানই ভারতের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক লেনদেন ভারতের মোট বাণিজ্যের মাত্র ০.০৬ শতাংশ। এর অর্থ, পাকিস্তান যদি ভারতীয় পণ্য আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধও করে দেয়, তাতে ভারতের অর্থনীতিতে খুব একটা চাপ সৃষ্টি হবে না। কিন্তু পাকিস্তানের জন্য দূরের দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে বেশি খরচ করতে হবে। অন্যদিকে, ভারত দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় পাকিস্তানের ভারতের বাজারে সীমিত রপ্তানিও মুখ থুবড়ে পড়বে। ফলে অর্থনৈতিক ভাবে ধুঁকতে থাকা ইসলামাবাদের বিপদ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উল্লেখযোগ্য রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে ভারত থেকে পাকিস্তানে যায় তুলো, খাদ্যশস্য, পশুখাদ্য ইত্যাদি। পাকিস্তান থেকে ভারতে আসে প্রধানত তামা, ফল, বাদাম ইত্যাদি।

আইএমএফ সহায়তা আটকানো থেকে আকাশসীমা বন্ধ: বহুমুখী চাপ

বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি পাকিস্তান ইতিমধ্যেই ভারতের কাছ থেকে একাধিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। সন্ত্রাসবাদে মদতের তথ্যপ্রমাণ পেশ করে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ) থেকে পাকিস্তানের অর্থসাহায্য আটকানোর চেষ্টা ভারত ইতিমধ্যেই শুরু করেছে। অন্যদিকে, সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করে পাকিস্তানে জল সরবরাহে রাশ টানার চেষ্টা চলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন আমদানি নিষেধাজ্ঞা। এছাড়া, পাকিস্তান থেকে ডাকযোগে চিঠিপত্র ও পার্সেল পাঠানো নিষিদ্ধ হওয়ায় যোগাযোগেও চাপ বাড়বে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ভারত এবং পাকিস্তান, দু’দেশই পারস্পরিক বিমানের জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে।

পহেলগাম হামলার পর ভারত–পাকিস্তানের সম্পর্কের চরম অবনতির কথা মাথায় রেখে শুধু দু’দেশের বিমানই নয়, অন্যান্য দেশের বহু উড়ানও এখন পাকিস্তানের আকাশসীমা এড়িয়ে যাচ্ছে। সূত্রের খবর, এর জেরে প্রতিদিন অন্তত ৩ মিলিয়ন বা ৩০ লক্ষ ডলার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে পাকিস্তানের! কারণ, পাক আকাশ এড়িয়ে যাওয়া বিমানগুলির থেকে কোনো ‘পরিষেবা ফি’ পাচ্ছে না পাকিস্তানের লাহোর এবং করাচি এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল (এটিসি)। এই অবস্থা চলতে থাকলে পাকিস্তানের রাজকোষের হাল আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামরিক প্রস্তুতিও পুরোদমে জারি: এলওসি থেকে এক্সপ্রেসওয়ে

এই বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক চাপসৃষ্টির মধ্যেই সামরিক প্রস্তুতিও পুরোদমে জারি রেখেছে ভারত। গত প্রায় ১০ দিন ধরে ভারত–পাক নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলওসি) পাকিস্তান সংঘর্ষবিরতি লঙ্ঘন করে গুলি চালাচ্ছে এবং ভারতীয় সেনাও তার যোগ্য জবাব দিচ্ছে। জম্মু–কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখার বরফঢাকা দুর্গম এলাকাগুলিতেও বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) নজরদারি বাড়িয়েছে। দেশের অভ্যন্তরেও প্রস্তুতি চলছে; উত্তরপ্রদেশের একাধিক এক্সপ্রেসওয়েতে যুদ্ধবিমান নামিয়ে পরীক্ষামূলক মহড়া চালিয়েছে ভারতীয় সেনা।

দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়েও দিল্লি সক্রিয়। শনিবার দিল্লিতে এসে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে প্রায় আধঘণ্টা বৈঠক করেন জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ভূস্বর্গের সর্বশেষ গ্রাউন্ড রিপোর্ট নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

পাক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা দাবি, ভারতের পাল্টা জবাব

সামরিক শক্তির প্রদর্শনও চলছে দুই পক্ষ থেকেই। শনিবারই পাক সেনাবাহিনী দাবি করে, তারা ৪৫০ কিমি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা করেছে। এর পাল্টা হিসাবে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে যে ভারতীয় সেনাও সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং তার হাতে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ডিআরডিও-র তৈরি অত্যাধুনিক মিসাইল ‘প্রলয়’, যা ৫০০–১৫০০ কিমি পর্যন্ত রেঞ্জে নির্ভুল আঘাত হানতে পারদর্শী। অন্তত ৩৭০টি এমন মিসাইল বানানোর বরাত ইতিমধ্যেই ডিআরডিওকে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি অত্যাধুনিক হালকা ওজনের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেনার বরাতও দিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। এই সিস্টেমে থাকছে ৮৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪৮টি লঞ্চার, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, পহেলগাম হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক – সব দিক থেকে চাপ বাড়াতে শুরু করেছে ভারত। এই পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি করেছে।