ডেলিভারির পর ইঞ্জেকশন থেকে ফের প্রসূতির মৃত্যু, অসুস্থ ১১ – নেপথ্যে কি নিকৃষ্ট ওষুধ?

মাসকয়েক আগেই মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে নিকৃষ্ট মানের রিঙ্গার্স ল্যাকটেট প্রয়োগের জেরে এক প্রসূতির মৃত্যু এবং আরও চারজনের গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ঘটনার স্মৃতি উস্কে দিয়ে এবার প্রায় একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল কামারহাটির কলেজ অফ মেডিসিন তথা সাগর দত্ত হাসপাতালে। ডেলিভারির পর একটি নির্দিষ্ট ইঞ্জেকশন দেওয়ার জেরে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ১১ জন মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই ঘটনার নেপথ্যে নিম্নমানের ওষুধ বা অন্য কোনও কারণ রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত রবিবার ও সোমবারে সাগর দত্ত হাসপাতালে সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ওই প্রসূতিদের এই ঘটনা ঘটে। একটি ইঞ্জেকশন প্রয়োগের পরই মোট ১১ জন প্রসূতি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে নিমতার বাসিন্দা পম্পা সরকার (৩৫) নামে এক প্রসূতির অবস্থা দ্রুত আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। মঙ্গলবার বিকেলে তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হলেও, দুর্ভাগ্যবশত, ওই দিন রাতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
প্রাথমিকভাবে এই বড় বিপত্তির নেপথ্যে সন্দেহের তির অ্যামিকাসিন নামে একটি অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশনের দিকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনার গুরুত্ব বুঝে এবং ঝুঁকি এড়াতে অ্যামিকাসিনের ওই পুরো ব্যাচের ওষুধ ব্যবহার অবিলম্বে বাতিল করে দিয়েছে। হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ তথা সুপার সুজয় মিস্ত্রির নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে মৃত প্রসূতি পম্পা সরকারের দেহের ময়নাতদন্ত কেন করা হলো না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাদের বক্তব্য, ওষুধের বিষক্রিয়া বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক কারণ খতিয়ে দেখতে ময়নাতদন্ত জরুরি ছিল।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকার এই প্রসূতি মৃত্যুকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। মঙ্গলবার রাতেই রাজ্যের স্বাস্থ্য–শিক্ষা দপ্তরের বিশেষ সচিব তথা ভারপ্রাপ্ত অধিকর্তা অনিরুদ্ধ নিয়োগী সাগর দত্ত হাসপাতালে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম শুক্রবার জানিয়েছেন, অন্যান্য প্রসূতিরা এখন ভালো আছেন, কিন্তু মৃত প্রসূতির মৃত্যুর কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। তাই স্বাস্থ্য দপ্তর বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের পাঁচজন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করছে। সাগর দত্ত হাসপাতালের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কমিটিকে অবশ্য স্বাস্থ্যভবন তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না বলেই সূত্রের খবর। স্বাস্থ্যকর্তাদের তরফে জানানো হয়েছে যে, যেহেতু পম্পার মৃত্যু অস্বাভাবিক ছিল না এবং তার পরিবারের তরফেও ময়নাতদন্তের দাবি ওঠেনি, তাই আইন অনুযায়ী দেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
এই ঘটনা নিয়ে রাজ্যের একাধিক চিকিৎসক সংগঠন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং সরব হয়েছে। সরকারি চিকিৎসকদের সংগঠন সার্ভিস ডক্টর্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সজল বিশ্বাস এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে ভেজাল রিঙ্গার্স ল্যাকটেটের জেরে যে ভাবে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছিল, সেই ধারা রাজ্যে এখনও বদলায়নি। নিম্নমানের বা ভেজাল ওষুধের কারণে সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।” আর এক সরকারি চিকিৎসক সংগঠন, অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের সাধারণ সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় অ্যামিকাসিন ইঞ্জেকশন সহ সংশ্লিষ্ট প্রসূতিদের দেওয়া সমস্ত ওষুধের নমুনা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার দাবি তুলেছেন।
চিকিৎসক সংগঠন মেডিক্যাল সার্ভিস সেন্টারের রাজ্য সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্র এই ঘটনার সম্পূর্ণ দায় রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরের উপর চাপিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, “মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলছে। ভেজাল ওষুধের ব্যবহার এবং বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রসূতি মৃত্যুর হারও বাড়ছে।” তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি এই ঘটনায় মেদিনীপুরের মতো নিম্নমানের ওষুধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে চিকিৎসায় অবহেলার নামে ডাক্তার–নার্স–স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর দায় চাপানো হয়, তবে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে নামবে তাদের সংগঠন।
সাগর দত্তের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যে ভাবে সিজারের মাত্র দু’দিনের মধ্যে ওই প্রসূতির শ্বাসকষ্ট, সেপসিস এবং মাল্টিপল অর্গান ফেলিওরে মৃত্যু হয়েছে, তাতে ওষুধের বিষক্রিয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি মনে করিয়ে দেন, মেদিনীপুরের ঘটনাতেও একই রকম উপসর্গ দেখা গিয়েছিল, যার পর অভিযুক্ত ফ্লুইড প্রস্তুতকারক সংস্থাকে উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনা রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং ব্যবহৃত ওষুধের গুণমান নিয়ে নতুন করে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির তদন্ত রিপোর্ট সামনে এলে মৃত্যুর আসল কারণ স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।