“জানলায় জোরে জোরে ধাক্কা…”-হোটেলের আগুন, আর্তনাদ আর ঝাঁপ, ভয়াবহ রাতের সাক্ষী পড়শিরা

মেছুয়া ফলপট্টির ‘ঋতুরাজ’ হোটেলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তা শুধু ১৪ জনের প্রাণহানিই ঘটায়নি, পাশের বাড়ির বাসিন্দাদের সামনে উন্মোচন করেছে এক মর্মান্তিক ও ভয়াল চিত্র। আগুনের লেলিহান শিখা, ঘন কালো ধোঁয়া এবং তার মধ্যে আটকে পড়া মানুষের বাঁচার জন্য তীব্র আর্তনাদ – এই বিভীষিকাময় দৃশ্য নিজেদের চোখের সামনে দেখেছেন হোটেলের ঠিক উল্টো দিকের আবাসনের বাসিন্দারা। তাঁদের বর্ণনা থেকেই উঠে এসেছে সেই রাতের ভয়াবহতার কথা।
হোটেলের সামনের রাস্তার উল্টোদিকেই রয়েছে চারতলা একটি আবাসন। সেই আবাসনের এক বাসিন্দা পবন জানান, তিনি নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছিলেন। হঠাৎ বাইরে প্রচণ্ড চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। দ্রুত ব্যালকনিতে এসে দেখেন হোটেলের দিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য ছিল যখন তিনি দেখলেন প্রাণ বাঁচাতে অনেকে হোটেলের জানলা দিয়ে নিচে ঝাঁপ মারছেন। পবনের মতে, বড়বাজারের মতো ঘিঞ্জি এবং অপরিকল্পিত বসতির কারণেই এমন ভয়াবহ পরিণতি হয়েছে।
ওই আবাসনেই অন্য একটি ফ্ল্যাটে থাকেন অবিনাশ গুপ্তা। তিনি বলেন, আগুনের তাপ ও ধোঁয়ার তেজ এতটাই ছিল যে তাঁদের নিজেদের ফ্ল্যাটের ভিতরে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় তাঁদের ফ্ল্যাটের লোকজনও বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। অবিনাশের কথায়, আগুনের ভয়াবহতা দেখে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের মধ্যেও চরম ভয় ছড়িয়ে পড়েছিল।
কাছেই শ্রমিকের কাজ করেন রাকেশ যাদব। ঘটনার খবর পেয়ে তিনি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছন, দেখেন অসংখ্য মানুষ দিশাহারা হয়ে ছোটাছুটি করছেন। উপরের দিকে চোখ যেতেই তিনি দেখেন অনেকে হোটেলের জানলার গ্রিল ধরে নিচে নামার চেষ্টা করছেন বা জানলায় সজোরে ধাক্কা মারছেন সাহায্যের জন্য। রাকেশের বর্ণনায় উঠে আসে আরও ভয়ঙ্কর চিত্র। তিনি বলেন, শিশু এবং বয়স্ক সহ অনেক লোক মেন গেটের কাছে এসেও ঘন ধোঁয়ায় আটকে গিয়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই চোখের সামনে ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সন্ধ্যা প্রায় ৮টা নাগাদ মেছুয়া ফলপট্টি সংলগ্ন জোড়াসাঁকোর ‘ঋতুরাজ’ হোটেলে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে দমকলের একাধিক ইঞ্জিন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও ততক্ষণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে। এই ঘটনায় মোট ৯৯ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে বা ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এবং একজন আতঙ্কিত হয়ে ওপর থেকে ঝাঁপ দেওয়ার কারণে মারা গেছেন। অগ্নিকাণ্ডে আহত ১৩ জনকে চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। হোটেলে কি পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল? ফায়ার অ্যালার্ম কি সময় মতো বেজেছিল? হোটেল কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু আগুনের সময় সেটি কাজ করেনি। ঘিঞ্জি এলাকার কারণে উদ্ধারকাজে সমস্যা হয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা বড়বাজার এলাকার অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের পরিকাঠামো নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলে দিল।