“কেউ চুপ করে থাকবে না..”-পাকিস্তানের দ্বিজাতি তত্ত্বের ‘খেলা’ ব্যর্থ করে দিলেন ওয়াইসি

সাধারণত বিজেপির এজেন্ট বলে পরিচিত অথবা গেরুয়া শিবিরের সমালোচনার মুখে থাকা অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (AIMIM)-এর প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়েছেন, তা রাজনৈতিক মহলে এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানের ‘ধূর্ত এবং পৈশাচিক খেলা’ ব্যর্থ করে দিতে তিনি যেন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
রবিবার মহারাষ্ট্রের পারভানিতে সংশোধিত ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের আয়োজনে এক সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওয়াইসি পাকিস্তানের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সময় ভারতের থেকে ৩০ মিনিট পিছিয়ে থাকলেও বাস্তবে ইসলামিক ভারতের থেকে তারা অর্ধ শতাব্দী পিছিয়ে আছে। পহেলগাঁও হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই ঘটনা দেখায় যে তোমরাই আইসিস-এর (ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠী) উত্তরসূরী।”
পাকিস্তানি নেতাদের পারমাণবিক হুমকির জবাবে ওয়াইসি বলেন, “আমাদের সামরিক বাজেট তোমাদের জাতীয় বাজেটের থেকে বড়। ভারতকে পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দেওয়া উচিত নয় পাকিস্তানি নেতাদের। তাদের মনে রাখা উচিত, যদি তারা অন্য দেশে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, তাহলে কেউ চুপ করে থাকবে না।” এআইমিম এবং রাজাকারদের ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও ওয়াইসি বরাবরই পাকিস্তানের একজন নির্দয় সমালোচক। তাঁর রাজনীতির ভিত্তি হলো ভারতীয় মুসলিম এবং সেখানে পাকিস্তানের কোনও জায়গা নেই বলেও তিনি মনে করেন।
ওয়াইসির এই সমালোচনার তাৎপর্য হলো, তিনি এটি করেছেন সংশোধিত ওয়াকফ আইন-বিরোধী একটি সমাবেশে। ওয়াকফ আইন ভারতীয় মুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গভীর সংবেদনশীল বিষয়। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড আয়োজিত এই প্রতিবাদ সভা থেকে পাকিস্তানকে আক্রমণ করে, পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া সন্ত্রাসবাদী হামলা থেকে ভারতীয় মুসলিমদের স্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখিয়েছেন ওয়াইসি।
উল্লেখ্য, পহেলগামে হামলাকারীরা পর্যটকদের কলমা পড়তে বলেছিল, যাতে মুসলিম ও অমুসলিমদের আলাদা করে অমুসলিমদের হত্যা করা যায়। এই হামলা ঘটেছিল পাক সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের এক ‘বিষাক্ত বক্তৃতার’ এক সপ্তাহের মধ্যেই। জেনারেল মুনির ওই বক্তৃতায় দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বলেন যে হিন্দু এবং মুসলিম দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতি। ভারত-পাক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, জেনারেল মুনিরের ওই বক্তৃতা ছিল হামলাকারীদের জন্য একটি ইঙ্গিত বা ‘হুইশল’, যা শুনে সন্ত্রাসবাদীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওই মন্তব্য পাকিস্তানি নাগরিকদের পাশাপাশি ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করেও ছিল, যাতে তাদের পাকিস্তানের পক্ষে টানা যায় এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে হামলায় সাম্প্রদায়িক রঙ চড়ানো যায়, যার ফলে জেনারেল মুনিরের ধূর্ত এবং পৈশাচিক পরিকল্পনাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এবং দ্বি-জাতি তত্ত্বকে ফের উসকে দেওয়া যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আসাদুদ্দিন ওয়াইসির বক্তব্য জেনারেল মুনিরের এই বিভেদমূলক প্রচারের মূলে সরাসরি আঘাত করেছে। সংশোধিত ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদ মঞ্চের মতো একটি ভারতীয় মুসলিম প্ল্যাটফর্ম থেকে একজন বিশিষ্ট মুসলিম নেতার মুখে পাকিস্তান এবং পাক সমর্থিত সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের কঠোর সমালোচনা, জেনারেল মুনিরের ধূর্ত এবং পৈশাচিক পরিকল্পনার উপর বড় আঘাত হেনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ওয়াইসির এই অবস্থান দ্বি-জাতি তত্ত্বকে খান-খান করে দিয়েছে এবং ভারতীয় মুসলিমদের পাকিস্তানের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতের প্রতি তাদের সংহতিকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছে।