অমাবস্যা তিথি ! রহস্যময় এই দিনটিতে সত্যি কি ভূত-প্রেতের শক্তি বাড়ে?

হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, প্রতিটি চান্দ্র মাসে দুটি পক্ষ থাকে – কৃষ্ণ পক্ষ এবং শুক্ল পক্ষ। পনেরো দিন করে মোট ৩০ দিনে পূর্ণ হয় একটি মাস। শুক্ল পক্ষের অন্তিম দিনটি পূর্ণিমা এবং কৃষ্ণ পক্ষের শেষ দিনটি অমাবস্যা নামে পরিচিত। পূর্ণিমায় চাঁদ থাকে সম্পূর্ণ আলোকিত, আর অমাবস্যায় চাঁদ থাকে অদৃশ্য। ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে অমাবস্যা তিথি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং রহস্যময় বলে বিবেচিত হয়। এই তিথিকে ঘিরে প্রচলিত আছে নানান বিশ্বাস ও ঐতিহ্য, যা যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক অমাবস্যার সাথে জড়িত ৫টি উল্লেখযোগ্য দিক ও রহস্য।
১. ‘অমা’ থেকে অমাবস্যা: শব্দটির উৎপত্তি ও তাৎপর্য
অমাবস্যা শব্দের উৎপত্তি চন্দ্রের ‘অমা’ কলা থেকে। ধর্মগ্রন্থে চন্দ্রের ষোলটি কলার (phases) উল্লেখ রয়েছে এবং ষোড়শ বা শেষ কলাটির নাম ‘অমা’। স্কন্দপুরাণে এই ‘অমা’কে চন্দ্রের সেই মহাকলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যা ক্ষয় বা উদয় হয় না এবং চন্দ্রের সমস্ত ষোলোটি কলার শক্তি এর মধ্যে নিহিত থাকে। এই ‘অমা’ থেকেই তিথিটির নামকরণ হয়েছে অমাবস্যা। এটি চন্দ্রের এমন এক অবস্থা যেখানে সে সম্পূর্ণভাবে সূর্যের সঙ্গে একই সরলরেখায় চলে আসে, যার ফলে পৃথিবীর দিক থেকে তাকে আর দেখা যায় না।
২. পিতৃপুরুষদের তিথি: কেন অমাবস্যা পূর্বপুরুষদের সঙ্গে যুক্ত?
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অমাবস্যা তিথির অধিপতি হলেন প্রয়াত পিতৃপুরুষেরা। এই কারণেই এই দিনে তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণ, শ্রাদ্ধ এবং পিণ্ডদান করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা অনুসারে, সূর্যের ‘অমা’ নামক এক বিশেষ রশ্মি পৃথিবীকে আলোকিত করে। যখন চন্দ্র এই ‘অমা’ রশ্মিতে অবস্থান করে, তখন সেই রশ্মির মাধ্যমে চন্দ্রের ঊর্ধ্বলোক থেকে পিতৃপুরুষেরা পৃথিবীতে আগমন করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। এজন্যই অমাবস্যাকে পিতৃপুরুষদের স্মরণ ও তর্পণ করার জন্য শ্রেষ্ঠ তিথি মনে করা হয়।
৩. নেতিবাচক শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি: কেন অমাবস্যা রাতকে ভীতিকর মনে করা হয়?
অমাবস্যা তিথিকে ঘিরে একটি প্রচলিত বিশ্বাস হলো, এই দিনে নেতিবাচক শক্তি বা ভূত-প্রেতের প্রভাব অন্যান্য দিনের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর কারণ হিসেবে মনে করা হয় যে, অমাবস্যায় চন্দ্রের আলো বা রশ্মি পৃথিবীতে পৌঁছায় না, ফলে পৃথিবী স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। এই ঘোর অন্ধকার পরিবেশ নেতিবাচক শক্তির ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হয়। তাই অনেক ঐতিহ্যেই পরামর্শ দেওয়া হয় যে, অমাবস্যার রাতে শ্মশান বা কবরস্থানের মতো স্থানগুলির কাছ দিয়ে অথবা নির্জন পথে একা যাওয়া উচিত নয়, কারণ এতে নেতিবাচক শক্তি সহজে প্রভাবিত করতে পারে।
৪. শ্রমিক ও যন্ত্রপাতির কাজ বন্ধ: কেন এই দিনে কর্মবিরতি রাখা হয়?
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, অমাবস্যায় শ্রমিক ও কারিগররাও তাদের যন্ত্রপাতির কাজ বন্ধ রাখেন। এই দিনে অনেকে নিজেদের কর্মক্ষেত্রের যন্ত্র বা সরঞ্জামগুলির পূজা করে থাকেন। এর কারণ হিসেবে মনে করা হয় যে, কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রপাতি থেকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে, এবং অমাবস্যায় নেতিবাচক শক্তির প্রভাব বেশি থাকায় সেই আশঙ্কা আরও বাড়ে। তাই সুরক্ষার জন্য এই দিনে যন্ত্রের কাজ বন্ধ রাখা বা সীমিত রাখা হয়। যন্ত্রের সুরক্ষা ও দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতা কামনায় পূজা করাও এই ঐতিহ্যের অংশ।
৫. ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা: কেন অমাবস্যায় যাত্রা শুভ মনে করা হয় না?
ভ্রমণের ক্ষেত্রেও অমাবস্যায় সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। বিশ্বাস করা হয় যে, এই দিনে দূর ভ্রমণে গেলে পথে বাধা আসার বা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্য সফল না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়াও জ্যোতিষশাস্ত্র বা ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুযায়ী, অমাবস্যায় চন্দ্রের শক্তির অভাব শরীরের জলীয় উপাদানের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। যেহেতু মানুষের শরীর বহুলাংশে জলীয় উপাদান দিয়ে গঠিত, তাই চন্দ্রের প্রভাব কম থাকায় এই দিনে মন বা মস্তিষ্কের উপর তার প্রভাব পড়ে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং এর ফলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এই সমস্ত কারণে অমাবস্যায় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এই সমস্ত বিশ্বাস ও প্রথা অমাবস্যা তিথিকে ধর্মীয় ও লোকায়ত সংস্কৃতিতে এক বিশেষ এবং রহস্যময় তাৎপর্য দান করেছে। এটি যেমন পিতৃপুরুষদের স্মরণ করার তিথি, তেমনই সতর্কতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণেরও দিন।