“ওর মতো বাহাদুর ছেলের জন্যই বোধহয় আমি…”, হিন্দুদের বাঁচাতে মৃত্যু আদিলের, গর্বিত কাশ্মীরি বাবা

গত মঙ্গলবার পহেলগাঁওয়ের বৈসরণ ভ্যালিতে জঙ্গিদের অতর্কিত হামলায় ২৬ জন নিরীহ ভারতীয় গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন। প্রাণ বাঁচাতে যখন যে যেদিকে পারছিলেন ছুটছিলেন, সেই চরম আতঙ্কের মুহূর্তেই অবিশ্বাস্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন স্থানীয় যুবক সইদ আদিল হুসেন শাহ। পেশায় টাট্টু ঘোড়ার চালক সইদ নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে বাকি নিরীহ পর্যটকদের বাঁচাতে এক জঙ্গির হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের সাহস দেখাতে যাওয়াই কাল হল। পরিণামে ঘাতকের বুলেটে প্রাণ হারাতে হল অনন্তনাগের এই বাসিন্দা যুবককে। যদিও ছেলের এমন আত্মত্যাগে চরম শোকের মধ্যেও গর্বিত তাঁর বাবা।

পহেলগাঁওয়ের এই মর্মান্তিক ঘটনায় সইদ আদিল হুসেন শাহের মৃত্যুতে তাঁর পরিবার এখন দিশেহারা। সইদ ছিলেন বাড়ির একমাত্র রোজগেরে। তাঁর আচমকা মৃত্যুর পর কীভাবে সংসার চলবে, কে খাবার আনবে, কে ওষুধ আনবে—এই সব চিন্তায় পরিবারটি ভেঙে পড়েছে। কিন্তু এই চরম দুঃখের মধ্যেও তাঁদের মনে একটাই শান্তি, যে ছেলে দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে, তাঁদের স্বার্থে নিজের প্রাণ দিয়েছে।

বার্তাসংস্থা এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সইদের বাবা হায়দার শাহ বলেন, “ওর (সইদ) জন্য গর্বিত আমি। সেটাই আমাকে বাঁচয়ে রেখেছে এখনও। নাহলে আমার জোয়ান ছেলের মৃতদেহ দেখে, ওর মুখ দেখে আমিও ওইখানেই মারা যেতাম হয়তো। ওর মতো বাহাদুর ছেলের জন্যই বোধহয় আমি বেঁচে আছি এখনও। ও যে নিজের প্রাণ দিয়েও কিছু মানুষকে বাঁচিয়েছে, এটা জেনেই আমার মাথা উঁচু হয়ে যাচ্ছে গর্বে।” সন্ধ্যা ৬টার দিকে ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, যারা সইদকে খুঁজতে গিয়েছিল তারা এসে তাঁকে ঘটনাটি সম্পর্কে জানিয়েছিল।

অন্যদিকে জঙ্গিদের গুলিতে নিহত সইদের মা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, “সে প্রতিদিন ৩০০ টাকা আয় করত। আমরা সন্ধ্যায় চাল কিনে একসঙ্গে খেতাম। এখন কে খাবার আনবে? কে ওষুধ আনবে?” সইদের বোন রবিসা জানান, সেদিন দাদার তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসার কথা ছিল। সে বলেছিল শরীর ভালো নেই এবং একদিন ছুটি নেবে। কিন্তু সে আর ফিরে আসেনি। বোন বলেন, দাদা জঙ্গির হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে অন্যদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। আর সেই চেষ্টাই কাল হয়, তিনটে গুলি তার বুকে লাগে।

জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহও সইদের এই আত্মত্যাগের জন্য গর্বিত বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “সইদ সন্ত্রাসবাদীদের থামানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং একজন সন্ত্রাসীর কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নেওয়ারও চেষ্টা করেন, তাই তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়।” কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “আমাদের পরিবারটির দায়িত্ব নিতে হবে এবং তাদের সাহায্য করতে হবে। আমি তাদের এই আশ্বাস দিতে এসেছি যে সরকার এই কঠিন সময়ে তাদের পাশে আছে এবং আমরা তাদের জন্য যা করতে পারি, করব।”

প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার ভোরেও টাট্টু ঘোড়াটিকে নিয়ে বৈসরন উপত্যকায় গিয়েছিলেন সইদ আদিল হুসেন শাহ। বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ গুলি চলার আওয়াজ আর মানুষের চিৎকার উপত্যকার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মারা যাওয়ার আগে বাড়ির সঙ্গে শেষ কোনো কথা হয়নি সইদের। তাঁকে বারবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। সাড়ে চারটে নাগাদ যখন তাঁর ফোনে রিং হতে থাকে, পরিবার ভেবেছিল তাহলে বোধ হয় সইদ নীচে নামছে উপত্যকা থেকে। কিন্তু হামলার খবর পাওয়ার পরেই তাঁর পরিবার থানায় এবং পরে হাসপাতালে ছুটে যায়। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। সইদ আসলে গুলির শব্দ শুনে পালিয়ে না গিয়ে জঙ্গির হাতের বন্দুক কেড়ে নিতে ছুটে গিয়েছিলেন। তখনই জঙ্গির সঙ্গে তার হাতাহাতি হয়। আর তার জেরে বুলেটের আঘাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এই সাহসী যুবক।