ভাগ্যের দেওয়া শেষ সুযোগ, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন অসমের অধ্যাপক, সাক্ষী থাকলেন সেই ভয়ানক দৃশ্যের

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের নৈসর্গিক বৈসারন উপত্যকার কাছে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ২৬ জনের মধ্যে ছিলেন অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দেবাশীষ ভট্টাচার্য। তবে ভাগ্যক্রমে তিনি নিজে সেই ভয়ানক মুহূর্তের জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে বেঁচে ফিরেছেন। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে বিশ্বাস আর নিছক ভাগ্য তাঁকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে। বুধবার অধ্যাপক ভট্টাচার্য জানান, হামলা শুরু হওয়ার সময় তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে বৈসারনে একটি গাছের নীচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, কার্যত ঘুমিয়েই পড়েছিলেন। আচমকা তিনি চারপাশে একটি গুঞ্জন শুনতে পান। কিছু লোক কালেমা পাঠ করছে। তাঁর কথায়, “স্বাভাবিকভাবেই, আমিও কালেমা পাঠ শুরু করি।” “কিছুক্ষণ পর, স্থানীয়দের মতো ছদ্মবেশী পোশাক পরা একজন সন্ত্রাসী আমাদের দিকে এগিয়ে আসে এবং আমার ঠিক পাশে শুয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে গুলি করে।”
বন্দুকধারী এরপর অধ্যাপক ভট্টাচার্যের দিকে তাকায়। তিনি শিউরে উঠে বলেন, “সে সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেয়া কর রহে হো?’ আমি তখন আরও জোরে কালেমা পাঠ করলাম। আমি জানি না কেন আমি এটা করেছিলাম। কোনো এক অজানা কারণে, সে আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলে যায়।” এই সুযোগে অধ্যাপক ভট্টাচার্য এক মুহূর্তও দেরি না করে তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সেখান থেকে প্রাণপণে পালিয়ে আসেন। তিনি জানান, “আমরা পাহাড়ে উঠেছিলাম, বেড়া পার হয়ে প্রায় দুই ঘন্টা হেঁটেছিলাম। পথে ঘোড়ার খুরের চিহ্ন দেখে আমরা সেই পথ অনুসরণ করি। অবশেষে, আমরা ঘোড়া সহ এক আরোহীর দেখা পাই এবং তাঁর সাহায্য নিয়ে আমাদের হোটেলে ফিরে আসতে সক্ষম হই।” ভয় ও আতঙ্কে তখনও কাঁপতে থাকা অধ্যাপক ভট্টাচার্য বলেন, “আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমি বেঁচে আছি।” বর্তমানে তাঁর পরিবার শ্রীনগরে রয়েছে এবং তাঁরা দ্রুত বাড়ির পথে রওনা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সকালে পহেলগাঁওয়ে বৈসরনে একদল পর্যটকের উপর অতর্কিত হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। এই নৃশংস হামলায় কমপক্ষে ২৬ জন পর্যটক নিহত হয়েছেন। নিষিদ্ধ পাকিস্তান-ভিত্তিক লস্কর-ই-তৈবা (এলইটি) নামক জঙ্গি গোষ্ঠী, যারা রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের ছায়া গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত, এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। কর্তৃপক্ষ সূত্রে খবর, নিহতদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও নেপালের দুই বিদেশি নাগরিক এবং দুজন স্থানীয় ব্যক্তিও রয়েছেন। এছাড়াও, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা এবং উত্তর প্রদেশের মতো ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পর্যটকরাও এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন নৌসেনা অফিসার ছিলেন যাঁর বিয়ের মাত্র সাত দিন পরেই এই ঘটনা ঘটল।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, তিনজন সন্ত্রাসী প্রথমে নিহতদের একত্রিত করে এবং পরিচয় নিশ্চিত করার আগে পুরুষ ও মহিলা দলে আলাদা করে। স্নাইপারের মতো কৌশল ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তিকে দূর থেকে গুলি করা হয়, এবং বাকিরা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, উদ্ধারকার্য ব্যাহত করার জন্যই ইচ্ছাকৃতভাবে এই স্থানটি বেছে নেওয়া হয়েছিল, যাতে হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়। এই হামলার পর এলাকায় রাত থেকে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিনার কর্পস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “হামলার জন্য দায়ী সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করার জন্য তদন্ত অভিযান চলছে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে সবরকম প্রচেষ্টা করা হচ্ছে।” ইতিমধ্যেই পুরো জম্মু ও কাশ্মীর জুড়ে জারি করা হয়েছে হাই অ্যালার্ট। তবে, শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে এই ধরনের হামলা প্রতিরোধ করতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে, সন্ত্রাসবাদের মূল কারণগুলো খুঁজে বের করে তা সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করাও অপরিহার্য। এই ঘটনায় বহু পর্যটকের প্রাণহানি এবং তাঁদের পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ এবং বিদেশি নাগরিকও ছিলেন, যা আন্তর্জাতিক স্তরেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তবে অধ্যাপক দেবাশীষ ভট্টাচার্যের সাহস এবং পরিস্থিতি মোকাবিলার মানসিকতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। তাঁর বেঁচে থাকার গল্প আমাদের কঠিন পরিস্থিতিতেও আশা না হারানোর অনুপ্রেরণা যোগায়।