“চোখের ভাষাই মেলাল দু’জনকে”-সোশ্যাল মিডিয়ার আলাপ থেকে চার হাত এক,বিয়ে নির্বাক জুটির

মুখ ফুটে কথা বলার সাধ্য নেই তাঁদের, নেই কানে শোনার ক্ষমতাও। কিন্তু ভাষার এই সীমাবদ্ধতা আটকে রাখতে পারেনি তাঁদের ভালোবাসার পথচলা। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আলাপ, এরপর ইশারার ভাষাতেই মন দেওয়া-নেওয়া। অবশেষে সেই ভালোবাসাই পরিণতি পেল শুভ পরিণয়ে। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন বাক্‌শক্তিহীন দ্বীপ রায় এবং অনামিকা।

পেশায় দিনমজুর দ্বীপ রায়ের বাড়ি জলপাইগুড়ির ধূপগুড়ি স্টেশনপাড়ায়। অনামিকা জলপাইগুড়ি জেলারই ময়নাগুড়ির চূড়াভাণ্ডার গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা। গত সোমবার (২১ এপ্রিল) দুই পরিবারের সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে ধুমধাম করে সম্পন্ন হলো তাঁদের বিয়ে।

ইশারার ভাষায় প্রেমকথা:

বছর খানেক আগে একটি সামাজিক মাধ্যমে আলাপ হয়েছিল দ্বীপ ও অনামিকার। দু’জনেই মূক ও বধির হওয়ার কারণে মুখে কথা বলতে পারতেন না। তাই প্রথমদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার টেক্সট মেসেজের মাধ্যমেই তাঁরা তাঁদের সমস্যা, ভালোলাগা এবং মনের ভাব আদানপ্রদান করতেন। ফোন নম্বর বিনিময় হওয়ার পর হোয়াটসঅ্যাপে শুরু হয় কথোপকথন। ধীরে ধীরে টেক্সটের পাশাপাশি ইশারার ভাষাও হয়ে ওঠে তাঁদের যোগাযোগের মাধ্যম। বাক্‌হীন হলেও তাঁরা একে অপরের মনের কথা খুব ভালোভাবে বুঝতে শিখেছিলেন এবং একে অন্যকে খুব ভালো করে চিনে নিয়েছিলেন। ভালোবাসার এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পর বিয়ের সিদ্ধান্তের কথা তাঁরা নিজেদের বাড়িতে জানালে উভয় পরিবারই সানন্দে সম্মতি দেয়।

বিয়ের আয়োজন ও বিধিনিষেধ:

দ্বীপ ও অনামিকার অভিভাবকরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে গত ২১ এপ্রিল বিয়ের দিন পাকা করেন। সেই অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিমন্ত্রণ করে ধুমধাম করে বিয়ের সমস্ত আয়োজন করা হয়। গত সোমবার গোধূলি লগ্নে মালাবদলের মাধ্যমে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। অনামিকাদের বাড়ির তরফে প্রীতিভোজেরও আয়োজন করা হয়েছিল।

তবে অনামিকার দাদা প্রণয় রায় জানিয়েছেন, সেদিন শাস্ত্র মতে তাঁদের বিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিয়ের কিছুক্ষণ আগেই দ্বীপের এক আত্মীয়ের আকস্মিক বিয়োগ ঘটে। ফলে নিয়ম মেনে বিয়ের সমস্ত আচার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তাই কেবল মালাবদল শেষ করেই নববধু অনামিকাকে সঙ্গে নিয়ে দ্বীপ তাঁর ধূপগুড়ির বাড়িতে চলে যান। প্রণয় রায় আরও জানিয়েছেন যে, আত্মীয় বিয়োগের পারলৌকিক বিধি এবং শ্রাদ্ধশান্তি শেষ হওয়ার পরেই দ্বীপের বাড়িতে বৌভাতের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে এবং সেখানেই বিয়ের বাকি আচার সম্পন্ন করা হতে পারে।

নতুন জীবনের জন্য প্রার্থনা:

এদিনের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ময়নাগুড়ির বিশিষ্ট সমাজসেবী রামমোহন রায়। নবদম্পতিকে আশীর্বাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “ওঁরা দু’জনেই বিশেষ ভাবে সক্ষম। ভাষার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের ভাব, চাওয়া-পাওয়া নিজেদের মতো করে বুঝেছেন। আমি মনে করি ওঁরা সঠিক জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছেন। ওদের আগামী দাম্পত্য জীবন যেন সুখের হোক, এটাই আমি মন থেকে প্রার্থনা করি।”

দ্বীপের বাবা জগৎ রায় ও মা গীতা রায়ও তাঁদের ছেলে-বৌমার জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। তাঁরা বলেন, “এদিন এক আত্মীয়ের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ায় বিয়ের সমস্ত আচার সম্পন্ন করা যায়নি। পারলৌকিক বিধি শেষ হলেই শাস্ত্রমতে আমাদের বাড়িতে ছেলের বিয়ের বাকি কাজ সম্পন্ন করা হবে এবং ধুমধাম করে ছেলে ও বৌমার বৌভাতের আয়োজন করব।”

বাক্‌হীন ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব গল্প তৈরি করে ইশারার ভাষায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন দ্বীপ ও অনামিকা। তাঁদের এই অনন্য পথচলা অনেককেই অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা করা যায়।