OMG! সংসারে ‘বোঝা’ কমাতে অসুস্থ মাকে খুন, গ্রেপ্তার হলেন ছেলে ও বৌমা

অভাব-অনটনের সংসারে অসুস্থ মা ‘বোঝা’ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর সেবাযত্ন এবং চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছিল পরিবার। এই পরিস্থিতি থেকে ‘নিস্তার’ পেতে শেষ পর্যন্ত নিজেদের জন্মদাত্রী মাকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল ছেলে ও বৌমা। নৃশংসভাবে খুন করে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি। প্রতিবেশীদের সন্দেহ এবং পুলিশের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছে এই অভিযুক্ত দম্পতি। সম্প্রতি চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের হাতিশালা এলাকায়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত প্রৌঢ়ার নাম কাজল মণ্ডল (৫৬)। তাঁর বাড়ি নিউ টাউনের লাগোয়া ভাঙড়ের বেওতা গ্রামে। এই ঘটনায় কাজল মণ্ডলের ছেলে রাজু মণ্ডল এবং তাঁর স্ত্রী সোমা মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মঙ্গলবার বারুইপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাদের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।

অভাব ও অশান্তিই কি খুনের কারণ?

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কাহিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেওতার বাসিন্দা রাজু মণ্ডল পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। সামান্য রোজগারে তাঁর সংসার কোনও রকমে চলত। এর উপর মাস ছয়েক আগে একটি দুর্ঘটনায় তাঁর মা কাজল মণ্ডল সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। বিছানাতেই মল-মূত্র ত্যাগ করতেন তিনি। রাজুর স্ত্রী সোমা তাঁর শাশুড়ির সেভাবে দেখভাল করতেন না বলে অভিযোগ। মায়ের সেবাশুশ্রূষার জন্য একজন আয়া রাখার মতো আর্থিক সামর্থ্য রাজুর ছিল না। এমনকি মায়ের ওষুধের টাকা জোগাড় করতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হতো। এই সকল বিষয় নিয়ে স্বামী রাজু এবং স্ত্রী সোমার মধ্যে প্রায় সারাদিনই ঝগড়া-অশান্তি লেগেই থাকত। পুলিশের অনুমান, এই অশান্তি এবং অসুস্থ মাকে নিয়ে তৈরি হওয়া সমস্যা থেকে মুক্তি পেতেই রাজু ও সোমা দুজনে মিলে কাজল মণ্ডলকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।

খুন করে আত্মহত্যার সাজানোর চেষ্টা, ফাঁস করল প্রতিবেশীর সন্দেহ:

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, সম্ভবত গত ১৮ এপ্রিল রাতে পরিকল্পনা মাফিক কাজল মণ্ডলকে খুন করা হয়। নাইলনের দড়ি গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল বলে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। মাকে খুন করার পর রাজু প্রতিবেশী এবং আত্মীয়-স্বজনদের ফোন করে জানায় যে তার মা আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু রাজুর এই কথায় সন্দেহ হয় পাড়া প্রতিবেশীদের। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, যে মহিলা গত ছ’মাস ধরে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী, যিনি বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেন না, তিনি কীভাবে নিজে নিজে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করবেন? স্থানীয় সূত্রে খবরটি পৌঁছায় হাতিশালা থানার পুলিশের কাছে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত রাজুর বাড়িতে পৌঁছায়। মৃতদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসার পরেই পুলিশের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটি কোনও আত্মহত্যা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। গত সোমবার পুলিশ রাজু এবং সোমাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসে। পুলিশের জেরার মুখে শেষ পর্যন্ত তারা মাকে শ্বাসরোধ করে খুন করার কথা স্বীকার করে নেয়।

হতবাক স্থানীয়রা:

এই ঘটনায় হতবাক ও স্তম্ভিত বেওতা গ্রামের পাড়া প্রতিবেশীরা। এলাকার বাসিন্দা খোকন বিশ্বাস বলেন, “ছেলেটিকে আমরা ভালো ছেলে বলেই জানতাম। বোঝেরহাট বাজারে কাঠের কাজ করত। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা বুঝতে পারছি না। স্বামী-স্ত্রী মিলে যদি সত্যিই মাকে খুন করে থাকে তাহলে ওদের কঠোর সাজা হওয়া দরকার।” বেওতা ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান উমা মণ্ডল বলেন, “এমন ঘটনা সিনেমায় হয় বলে জানি। বাস্তবে কখনও শুনিনি। তবে অভিযুক্ত ছেলে ও বৌমা সম্পর্কে কেউ কোনও দিন আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ করেননি। আসল ঘটনা কী আছে, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। আমরা চাই, এই রহস্যের দ্রুত কিনারা হোক।”

অভাবের তাড়না এবং অসুস্থ মায়ের প্রতি উদাসীনতা কীভাবে একটি ছেলেকে তার জন্মদাত্রী মা’কে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে ঠেলে দিল, এই ঘটনা সেই প্রশ্নই তুলে ধরেছে।