পাক অধিকৃত কাশ্মীরে রক্তগঙ্গা! শেহবাজের ভুয়ো ভোটের খপ্পরে জ্বলছে PoK, মৃত ৪০!

গত ২ অগাস্ট পাক অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) দ্বিতীয় দফার নির্বাচন সম্পন্ন হলেও, তার রেশে পুরোপুরি উত্তপ্ত কাশ্মীর উপত্যকা। সাধারণ মানুষের ওপর পৈশাচিক অত্যাচার এবং প্রতিবাদীদের বন্দুকের নলে স্তব্ধ করে দেওয়ার পর, বিশ্বমঞ্চে গণতন্ত্রের সবক দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের দল PML-N। বিরোধী দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP)-র বিস্ফোরক অভিযোগ, এই নির্বাচনে নজিরবিহীন রিগিং বা ভোট লুঠ করেছে শেহবাজের দল।

রক্তাক্ত উপত্যকা ও তড়িঘড়ি ভোটের নেপথ্য কারণ

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী প্রথমে ২৭ জুলাই ভোট হওয়ার কথা থাকলেও, হঠাৎই তা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। প্রশাসনের দাবি ছিল— নিরাপত্তার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ। অথচ একদিকে যখন ভোটগ্রহণ চলছে, তখন গোটা পাক অধিকৃত কাশ্মীর কার্যত বারুদস্তূপে পরিণত হয়েছে। সিভিল সোসাইটির যৌথ মঞ্চ ‘জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (JAAC)-এর নেতৃত্বে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার ক্ষুব্ধ বাসিন্দা। গত কয়েক মাস ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে JAAC-র সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে পাক সেনা ও পুলিশ। দিনের পর দিন ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রেখে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে প্রতিবাদীদের দমন করছে পাকিস্তান সরকার। গত এক সপ্তাহেই শেহবাজ শরিফের বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন সাধারণ মানুষের প্রাণ গেছে।

এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারত। অন্যদিকে, জাতিসংঘের (UN) মানবাধিকার প্রধানও এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছেন। তবে সমস্ত আন্তর্জাতিক চাপ এড়িয়ে এই রক্তলীলার দায় ভারতের ঘাড়ে চাপাতে মরিয়া ইসলামাবাদ। পাক প্রশাসনের দাবি, JAAC-র এই আন্দোলনকে মদত দিচ্ছে নয়াদিল্লি। যদিও ভারতের পক্ষ থেকে এই ভিত্তিহীন দাবি সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।

উত্তপ্ত PoK-এ কেন এই নির্বাচন?

পাক অধিকৃত কাশ্মীর বিধানসভায় মোট আসন সংখ্যা ৫৩। এর মধ্যে ৫টি আসন মহিলাদের জন্য, ১টি ধর্মীয় নেতার (উলেমা), ১টি প্রবাসী কাশ্মীরি এবং ১টি টেকনোক্র্যাটদের জন্য সংরক্ষিত। তবে সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৯৪৭ সালের জম্মু-কাশ্মীর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পাকিস্তানের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ ১২টি সংরক্ষিত আসন।

গত ২ অগাস্ট মূলত এই ১২টি আসনের জন্যই ভোটগ্রহণ হয়, যার মধ্যে মুজফ্ফরাবাদের ৯টি আসনও অন্তর্ভুক্ত। JAAC-র মূল দাবিগুলির একটি হলো— এই বিতর্কিত ১২টি আসন অবিলম্বে বিলোপ করতে হবে। আর এখানেই সরকারের সঙ্গে তৈরি হয়েছে তীব্র মতবিরোধ।

কে এই JAAC এবং কী তাদের দাবি?

পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ব্যবসায়ী, আইনজীবী, ছাত্র-ছাত্রী ও বিভিন্ন সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে গঠন করেছেন জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (JAAC)। ২০২৩ সালে মূলত গম ও বিদ্যুতের আকাশছোঁয়া দাম বৃদ্ধি, সরকারি আধিকারিকদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এবং PoKবাসীর সমান অধিকারের দাবিতে এই সংগঠন প্রথম আন্দোলনের ডাক দেয়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ৩৮টি সুনির্দিষ্ট দাবি নিয়ে বড়সড় আন্দোলনে নামে JAAC। সাধারণ মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং পাকিস্তানের অন্যান্য চারপ্রদেশের মতো PoK-কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হয়। মূলত ইসলামাবাদের দিনের পর দিন শোষণ এবং ওই অঞ্চলে জঙ্গি ঘাঁটি তৈরির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে এখন সবচেয়ে বড় প্রতিবাদের মুখ এই সংগঠন।

কেন এই ১২টি আসন নিয়ে এত বিতর্ক?

পাক সরকারের সঙ্গে JAAC-র মূল সংঘাতের জায়গাটি হলো এই ১২টি সংরক্ষিত আসন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মূল অভিযোগ— PoK-র সাধারণ মানুষ এই আসনগুলিতে ভোট দিতে পারেন না, এমনকি এখান থেকে কোনও প্রার্থীও দাঁড়াতে পারেন না। ফলস্বরূপ, এই আসনগুলির ভোটার বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কারওরই পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বাস্তব পরিস্থিতি বা জনজীবন সম্পর্কে কোনো ধারণাই থাকে না।

সাধারণত কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা শাসক দলই এই ১২টি আসনে জয়লাভ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই আসনগুলিকে হাতিয়ার করে ইসলামাবাদ সরাসরি PoK বিধানসভায় নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধ করে।

এই ১২টি আসনের মধ্যে ৭টি পঞ্জাব প্রদেশভিত্তিক এবং ১টি খাইবার পাখতুনখোয়ায় অবস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, ‘জম্মু-VI’ আসনের ভোটাররা পঞ্জাব, ইসলামাবাদ এবং খাইবার পাখতুনখোয়া জুড়ে বিস্তৃত; আবার ‘ভ্যালি-I’ আসনের ভোটাররা সিন্ধ ও বালুচিস্তানে ছড়িয়ে রয়েছেন। বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী শরণার্থী জনগোষ্ঠীর সংখ্যার ভিত্তিতেই এই আসনগুলির বণ্টন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সরকারের সমর্থক মহলের যুক্তি— কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরিদের রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষা দেয়। তাদের দাবি, ভারতও জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভায় পাকিস্তানের দখলে থাকা এলাকার বাসিন্দাদের জন্য আসন বরাদ্দ রেখেছে, যদিও ভারতের ক্ষেত্রে সেই আসনগুলি ফাঁকা রাখা হয়।

আন্দোলনকারীদের ওপর কেন এই নির্মম দমনপীড়ন?

পাকিস্তানের প্রাক্তন ভারতীয় হাইকমিশনার টি সি এ রাঘবনের মতে, পাক অধিকৃত কাশ্মীরে হতাহতের এই অস্বাভাবিক পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে বর্তমান গ্রীষ্মে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম চাপের মুখে রয়েছে। একদিকে বালুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ার অশান্তি, অন্যদিকে আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান সীমান্ত সমস্যা— সব মিলিয়ে পাক নিরাপত্তা বাহিনী দিশেহারা। আর এর জেরে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা শুধু পাকিস্তানের জন্যই বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠেনি, বরং কাশ্মীর নিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসের ভিতকেও নাড়িয়ে দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *