বিশেষ: নিজ অক্ষে ইউরেনাস কত জোরে ঘোরে? জেনেনিন কি বলছে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা?

রেকর্ড-ভাঙা নির্ভুলতার সঙ্গে ইউরেনাসের ঘূর্ণনের হার নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, সৌরজগতের অন্যতম রহস্যময় গ্রহ ইউরেনাসকে বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ধরনের অগ্রগতি।
হাবল স্পেস টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া দশ বছরেরও বেশি সময়ের ডেটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বের করেছেন, নিজের অক্ষের উপর একবার ঘুরতে ইউরেনাসের ঠিক কত সময় লাগে। এর অর্থ, বিজ্ঞানীরা অবশেষে সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পেরেছেন ইউরেনাসের এক দিনের দৈর্ঘ্য কত।
গবেষকদের দাবি, তাদের এই নতুন গবেষণার ফলাফল আগের যেকোনো পরিমাপের চেয়ে হাজার গুণ বেশি নির্ভুল। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ফ্রান্সের ‘অবজারভেটরি দ্য পাঁরি পিএসএল’ ও ‘এইক্স মার্সেই ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক লরেন্ট লামির নেতৃত্বাধীন একদল গবেষক।
তাঁরা বলছেন, ইউরেনাস ঠিক ১৭ ঘণ্টা, ১৪ মিনিট ও ৫২ সেকেন্ডে একটি পূর্ণ ঘূর্ণন বা আবর্তন সম্পন্ন করে, যা ১৯৮৬ সালে গ্রহটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাসার ভয়েজার ২ মহাকাশযানের অনুমানের চেয়ে ২৮ সেকেন্ড বেশি।
বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট নোরিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরেনাসের এই আবর্তনের পার্থক্যটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও বিজ্ঞানীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ইউরেনাসের ঘূর্ণন সঠিকভাবে জানার জন্য সংগ্রাম করেছেন, কারণ তাদের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স পয়েন্ট ছিল না।
গবেষণা দলটি আগের অনুমানের নানা সমস্যা সমাধানের জন্য একটি নতুন কৌশল ব্যবহার করেছে। এর জন্য তাঁরা ইউরেনাসের অরোরা নিয়ে গবেষণা করেছেন, যা গ্রহটির উপরের বায়ুমণ্ডলের সুন্দর ও উজ্জ্বল আলো। মহাকাশ থেকে আসা চার্জযুক্ত কণা যখন গ্রহটির দুই মেরুর কাছে থাকা চৌম্বক ক্ষেত্রের সংস্পর্শে আসে, তখন এই অরোরা তৈরি হয়।
গবেষকরা বলছেন, এই অরোরা প্রাকৃতিক বাতিঘরের মতো ইউরেনাসের সঙ্গে ঘোরে। এই আলোর গতিপথ ট্র্যাক করে তাঁরা বিস্ময়কর নির্ভুলতার সঙ্গে ইউরেনাসের ঘূর্ণনের ‘সময়’ নির্ধারণ করেছেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ইউরেনাসের অরোরা থেকে অতিবেগুনী আলো পর্যবেক্ষণ করেছে, যা বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণের জন্য অবিচ্ছিন্ন ডেটার সরবরাহ করেছে। এর ফলে গ্রহটির ঘূর্ণন সংকেত আগের চেয়ে আরও স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
পৃথিবী, এমনকি শনি ও বৃহস্পতির বিপরীতে ইউরেনাস একটি অস্বাভাবিক গ্রহ। এর চৌম্বক ক্ষেত্রটি অদ্ভুতভাবে এক কোণে কাত হয়ে আছে এবং এটি এর ঘূর্ণন অক্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যার কারণে ইউরেনাসের অরোরা অপ্রত্যাশিত আচরণ করে।
গবেষকরা বলছেন, ইউরেনাস কীভাবে ঘোরে তা বোঝার মাধ্যমে এর চৌম্বকীয়মণ্ডল, যা গ্রহটির চারপাশে প্রতিরক্ষামূলক চৌম্বকীয় বুদবুদ তৈরি করেছে, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।
তাঁরা আরও জানান, এই নতুন পরিমাপটি একেবারে সঠিক সময়ে এসেছে, কারণ ভবিষ্যতে মহাকাশ অনুসন্ধানের জন্য ‘ইউরেনাস অরবিটার অ্যান্ড প্রোব’ মিশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হাবল এবং এই নতুন গবেষণার ফলাফল এখন ওই মিশনের পরিকল্পনার জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করবে।