“যেখানে দাঙ্গা হয়েছে, সেটা তো কংগ্রেসের জেতা আসন”-গুরুতর দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াকফ (সংশোধনী) আইন ২০২৫-এর বিরোধিতায় সাম্প্রতিক হিংসার ঘটনায় কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন। মঙ্গলবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ইমাম ও মোয়াজ্জেমদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি দাবি করেন, মালদা দক্ষিণ লোকসভা আসনে, যেখানে কংগ্রেসের ইসা খান সাংসদ, সেখানেই এই অশান্তির সূত্রপাত। মমতা আরও কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি, বিএসএফ এবং এনডিএ-র শরিক নিতিশ কুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডুকে তীব্র আক্রমণ করেন।
মালদা ও মুর্শিদাবাদে অশান্তি
মমতার দাবি, মালদার মোথাবাড়িতে প্রথমে অশান্তি শুরু হয়, যদিও কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরপর মুর্শিদাবাদের সুতি, সামশেরগঞ্জ, ধুলিয়ান ও জঙ্গিপুরের মতো এলাকায় হিংসা ছড়ায়। এই ঘটনায় তিনি কংগ্রেসকে দায়ী করে বলেন, “ওয়াকফ নিয়ে কিছু অশান্তি ঘটেছে। প্ররোচনামূলক কথা হয়েছে। এটা মুর্শিদাবাদ না, হয়েছে মালদাতে। ওটা কংগ্রেসের জেতা আসন। জেতার সময় জিতবে আর দাঙ্গা হলে পরিস্থিতি সামলাবেন না, এটা হয় না।” তিনি দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেস এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে তাদের পার্টি অফিস ও কর্মীদের বাড়ি ভাঙা হতো। তবে তিনি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
কেন্দ্র ও বিএসএফের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মমতা কেন্দ্রীয় সরকারের উপরও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের সংবিধান সম্পত্তি অর্জন ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আপনি রাম-রহিম সবার সম্পত্তি কাড়ছেন। গভর্মেন্ট অফ ইন্ডিয়া এত তাড়া কীসের?” তিনি বাংলাদেশের অস্থির পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে অভিযোগ করেন, বিএসএফ বাংলাদেশ থেকে লোক আসা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে অশান্তি ছড়িয়েছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়ে এসেছে, এর দায়িত্ব বিএসএফের। বাংলার না। আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে কেন এদের আটকাতে পারলেন না।”
মমতা আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকার এজেন্সির মাধ্যমে লোক নিয়ে এসে দাঙ্গা সৃষ্টি করছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “আপনি চান হিন্দু-মুসলমান ভাগাভাগি করতে? জনজাতি, শিখদের বিরুদ্ধে কথা বললে ছাড় পাবেন? ভারতে একতা না থাকলে দেশ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।”
নিতিশ-চন্দ্রবাবুকে নিশানা
কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক নিতিশ কুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডুকেও তিনি আক্রমণ করেন। মমতা বলেন, “নিতিশ, চন্দ্রবাবু চুপচাপ বসে থাকেন। ভাবেন ক্ষমতা দিয়ে দেবে। দুই তৃতীয়াংশ মেজরিটিতে এই বিল পাশ হওয়া উচিত ছিল। আপনারা সংবিধান সংশোধন করেননি। যা করেছে তাতে আমরা সমর্থন করিনি, আর করবও না।” তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বলেন, “এটা বিজেপির প্ল্যান। রামনবমীর দিন করত। সেটা আপনারা ভেস্তে দিয়েছেন।”
ইন্ডিয়া জোটের প্রতি আমন্ত্রণ
হিংসার ঘটনায় কংগ্রেসকে দায়ী করলেও মমতা ইন্ডিয়া জোটের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ান। তিনি বলেন, “আমি উস্কানি দিতে আসিনি। কারণ আমি শান্তি চাই।” তবে তিনি স্পষ্ট জানান, রাজ্যে ওয়াকফ আইন কার্যকর হবে না। এই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শান্তি রক্ষার আহ্বান জানান এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ওয়াকফ আইন নিয়ে অশান্তি রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিজেপি নেতা অমিত মালব্য ও সুকান্ত মজুমদার মমতাকে পালটা আক্রমণ করে দাবি করেছেন, তাঁর নীতিই রাজ্যে অশান্তির কারণ। বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক তরুণ চুঘ মমতার ভূমিকাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে কটাক্ষ করেন। অন্যদিকে, রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বিজেপির উস্কানিকে দায়ী করে বলেন, “বাংলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মাটি। বিজেপির উস্কানিতে কিছু মীরজাফর এটা করছে।”
বর্তমান পরিস্থিতি
মুর্শিদাবাদে হিংসায় এখনও পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১১০ জনের বেশি গ্রেফতার হয়েছেন। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, যদিও বিক্ষিপ্ত অশান্তির খবর এখনও পাওয়া যাচ্ছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মমতার এই বক্তব্য এবং বৈঠক আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে তিনি শান্তি ও সম্প্রীতির উপর জোর দিয়ে বলেন, “ভাগ করবেন না, ভারতকে জুড়ুন।”