“কারা চাকরি খেতে চায়, সে দিকে নজর রাখুন”-চাকরিহারাদের সতর্ক করছে রাজ্য সরকার

বিকাশ ভবনের বৈঠকে চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় গিয়েছিলেন বহু চাকরিহারা। সেই আশা পূরণ না হলেও, রাজ্য সরকার তাঁদের ‘বিরোধী চেনার’ পাঠ দিয়েছে বলে অভিযোগ। সূত্রের খবর, বৈঠকে শিক্ষা দপ্তরের শীর্ষকর্তারা বারবার চাকরিহারাদের পরামর্শ দিয়েছেন, আগামী ১৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ যে আপিল করেছে, তার বিরোধিতা কারা কারা করছে, সেই তালিকা নিজেদের কাছে রাখতে।

ওই দিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুও একই সুর তোলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তো বারবারই ওঁদের (চাকরিহারাদের) বলছি, কারা আপনাদের চাকরি রাখতে চায় আর কারা চাকরি খেতে চায়, সে দিকে নজর রাখুন। ১৭ এপ্রিল মধ্যশিক্ষা পর্ষদের দায়ের করা মামলার বিরোধিতা কারা করছেন সে দিকে নজর দিন। যাঁরা বিরোধিতা করবেন, জানবেন তাঁরাই চায় না আপনাদের চাকরি থাকুক।’ এভাবেই মন্ত্রী চাকরিহারাদের ‘মুখ এবং মুখোশ’ আলাদা করার পরামর্শ দিয়েছেন।

২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস লাগাতার বিরোধীদের নিশানা করছে। এমনকি, যাদের চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তারাই চাকরি কেড়ে নিতে চাইছে বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের সভায় বিরোধীদের নাম না করে একাধিকবার মন্তব্য করেছেন। সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্যের নাম উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘কেন বিকাশ ভট্টাচার্যকে এরপর রাজনৈতিক ভাবে একঘরে করা হবে না, আমি জানতে চাই।’ সেই পথ ধরেই বিকাশ ভবনের বৈঠকে চাকরিহারাদের ‘ভোকাল টনিক’ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

এই পরিস্থিতিতে চাকরিহারাদের নেতা মেহবুব মণ্ডল হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা বিরোধী ও শাসক উভয় পক্ষকেই অনুরোধ করতে চাইছি, আপনারা ব্যক্তিগত বিবাদ ভুলে রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ত্যাগ করে এক টেবিলে বসে আলোচনা করুন। কীভাবে যোগ্য বঞ্চিতদের চাকরি ফেরানো যায়, তা নিয়ে একটি ঐক্যমতে পৌঁছন।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে তৃণমূল। এই পরিস্থিতির জন্য বিরোধীদের চক্রান্তকেই দায়ী প্রমাণ করতে চাইছে শাসক দল। তৃণমূলের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া ক্ষোভের আবহাওয়াকে সহানুভূতিতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছে তারা। বৈঠকের আলোচনায় চাকরি ফেরানোর কোনও সুস্পষ্ট দিশা না থাকলেও, একটি রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি করার চেষ্টা স্পষ্ট ছিল।

তবে, সিপিএম সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্য এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘একশোবার বিরোধিতা করব। তৃণমূলের দুর্নীতিকে সমর্থন করার কোনও মানেই হয় না। কারণ, ওই আবেদনে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ দুর্নীতি করে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়া একদলকে বহাল তবিয়তে স্কুলে রেখে দিতে চায়।’ বিজেপি নেতা তথা আইনজীবী তরুণজ্যোতি তিওয়ারিও একই সুরে বলেন, ‘মানুষ এতদিনে বুঝে গিয়েছে কে চাকরি খেকো আর কে চাকরি বিক্রেতা। মধ্যশিক্ষা পর্ষদ নিজেই নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িত। তাই তাদের আবেদনের বিরোধিতা তো হবেই এবং তা জোরালো ভাবেই করা হবে।’

যোগ্য শিক্ষক, কর্মীদের পাশেই শিক্ষক সমাজ

এদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ মেনে অনেক চাকরিহারা শিক্ষক স্কুলে গেলেও, কেন তাঁরা স্কুলে যাচ্ছেন সেই প্রশ্ন তুলে আদালত অবমাননার নোটিস পাঠানো হয়েছে শিক্ষা দপ্তরের সচিব বিনোদ কুমার, শিক্ষা দপ্তরের কমিশনার অরূপ সেনগুপ্ত, স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার এবং মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি রামানুজ গঙ্গোপাধ্যায়কে। এসএসসি মামলার মূল মামলাকারী ববিতা সরকার, সেতাব উদ্দিন, নাসরিন খাতুন, লক্ষ্মী তুঙ্গা এবং আব্দুল গনি আনসারির পক্ষ থেকে আইনজীবী ফিরদৌস শামিম এবং গোপা বিশ্বাস এই আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন। নোটিসে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, আদালতের স্পষ্ট রায়ের পরেও কীভাবে এই চাকরিহারা শিক্ষকরা স্কুলে যাচ্ছেন? এটা কি আদালত অবমাননা নয়?

এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেও চাকরিহারা শিক্ষকরা রাজপথেই নিজেদের আন্দোলন জারি রেখেছেন। এসএসসি ভবনের সামনে শুক্রবার রাতভর অবস্থান বিক্ষোভের পর শনিবার সকালে তাঁরা ধর্মতলার গান্ধীমূর্তির পাদদেশে লাগাতার ধর্না আন্দোলন শুরু করেছেন। চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে তাঁদের লড়াই অব্যাহত রয়েছে।