বিশেষ: ক্লান্তি আর বিষণ্ণতার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? জেনেনিন কি বলছে গবেষকরা?

চেহারায় ক্লান্তি এবং বিষণ্ণতার প্রকাশ অনেক সময় একই রকম মনে হতে পারে। দুটি অবস্থাই মানুষের মনে অস্বস্তি ও দুর্বলতা সৃষ্টি করে। তবে, ক্লান্তি এবং বিষণ্ণতা দুটি ভিন্ন মানসিক অবস্থা, যাদের কারণ ও চিকিৎসার পদ্ধতিও আলাদা।
অনুমান করা হয়, অস্ট্রেলিয়ার কর্মজীবী জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ কোনো না কোনো সময়ে ক্লান্তিতে ভোগেন। অন্যদিকে, প্রায় ২০ শতাংশ অস্ট্রেলিয়ান তাদের জীবনে একবার হলেও বিষণ্ণতার শিকার হয়েছেন। ক্লান্তি হলো এক ধরনের অসহায় বোধ করা, যেখানে বিষণ্ণতা অনেকটা গভীর হতাশার মতো অনুভূতি। এই দুটি মানসিক অবস্থার কারণ ভিন্ন হতে পারে এবং প্রত্যেকেরই উচিত তাদের নিজস্ব পরিস্থিতি অনুযায়ী এইগুলির মোকাবিলা করা।
ক্লান্তি কী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ক্লান্তিকে একটি ‘পেশাগত অবস্থা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা অতিরিক্ত কাজের চাপের ফলস্বরূপ দেখা দেয়। যদিও এটি মূলত কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত, তবে যারা শিশু বা বয়স্ক বাবা-মায়ের যত্ন নেন তারাও ক্লান্তির ঝুঁকিতে থাকেন। ‘সিডনি বার্নআউট মেজার’-এর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসকদের মূল্যায়নে ক্লান্তির প্রধান লক্ষণগুলি হলো:
- প্রাথমিক লক্ষণ অবসাদ বা শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি।
- মনোযোগের অভাব এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাস।
- কোনো কিছুতে আনন্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা বোধ করা।
- সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা বিচ্ছিন্নতা অনুভব করা।
- মেজাজের অস্থিরতা, যেমন উদ্বিগ্ন ও বিরক্ত বোধ করা।
- কাজের ক্ষমতা বা কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া।
সাধারণত, একটানা এক বা দুই সপ্তাহ ধরে অতিরিক্ত কাজের চাপের ফলে মানুষ ‘ক্লান্তি অনুভব’ করতে পারেন। তবে, বছরের পর বছর ধরে অবিরাম কাজের চাপের কারণে চরম পর্যায়ের ‘ক্লান্তিকর’ অনুভূতি তৈরি হতে পারে, যা বার্নআউটের দিকে ধাবিত করে।
বিষণ্ণতা কী?
বিষণ্ণতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো আত্মসম্মান কমে যাওয়া, নিজের প্রতি অতিরিক্ত সমালোচনা এবং সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার মতো অনুভূতি। তবে এই লক্ষণগুলি থাকলেই কারো ক্লিনিক্যাল বিষণ্ণতা রয়েছে তা বলা যায় না, কারণ বিষণ্ণতার রোগ নির্ণয়ের জন্য আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করা হয়। মূলত দুই ধরনের ক্লিনিক্যাল বিষণ্ণতা দেখা যায়:
- মেলানকোলিক বিষণ্ণতা: এটিকে জিনগত কারণভিত্তিক বলে মনে করা হয় এবং এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রত্যাশিতভাবে শুরু হতে পারে।
- নন-মেলানকোলিক বিষণ্ণতা: এটি পরিবেশগত বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী, যেমন সম্পর্কের অবনতি বা মূল্যবোধের অভাব এর প্রধান কারণ হতে পারে।
ক্লান্তির কিছু বৈশিষ্ট্য ‘মেলানকোলিক’ বিষণ্ণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, যেমন আনন্দ, শক্তি এবং মনোযোগের অভাব। একইভাবে, ‘নন-মেলানকোলিক’ বিষণ্ণতার সঙ্গেও ক্লান্তির কিছু লক্ষণ মিলে যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে অনুপ্রেরণার অভাব এবং ঘুম বা প্রফুল্ল হতে অসুবিধা। উভয়ের ক্ষেত্রেই পরিবেশগত কারণ কিছুটা একই রকম হতে পারে।
মূল কারণের পার্থক্য
ক্লান্তি এবং বিষণ্ণতার মধ্যেকার মূল পার্থক্য তাদের অন্তর্নিহিত কারণগুলির মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যারা পারফেকশনিস্ট অর্থাৎ সব কাজ নিখুঁতভাবে করতে চান, তারা ক্লান্তির ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। তবে, বিষণ্ণতায় ভোগার ঝুঁকি তাদের কম হতে পারে, কারণ তারা বিষণ্ণতার পরিস্থিতিতে কোনো ঘটনা এড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন।
সাধারণত, চাহিদা, প্রত্যাশা বা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে না পারার কারণে মানুষ কাজে অতিরিক্ত নিমগ্ন হয়ে পড়ে ক্লান্তি অনুভব করেন, যা তাদের মধ্যে অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি করে।
অন্যদিকে, বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের আত্মসম্মানবোধ হ্রাস পায়। তাই তারা অসহায় বোধ করার পরিবর্তে মনে করেন যে তারা এবং তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
তবে, একই সময়ে ক্লান্তি এবং বিষণ্ণতা উভয়ই অনুভব করা অস্বাভাবিক নয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মীর উপর তার বস যদি অতিরিক্ত কাজের চাপ দেন, তবে সেই কর্মী ক্লান্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একই সময়ে, বস যদি কাজের জন্য ওই কর্মীকে অপমান করেন, তবে তার ‘নন-মেলানকোলিক’ বিষণ্ণতাও তৈরি হতে পারে।
ক্লান্তি এবং বিষণ্ণতার লক্ষণগুলি আপাতদৃষ্টিতে একই রকম মনে হলেও, তাদের মূল কারণ এবং মোকাবিলার পদ্ধতি ভিন্ন। নিজের মানসিক অবস্থা সঠিকভাবে বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনে মনোবিদ বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।