বিশেষ: মিয়ানমারে কেন এত বড় বিধ্বংসী ভূমিকম্প হলো? জেনেনিন কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

মিয়ানমারে শুক্রবার আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দুর্যোগ মডেলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলীয় স্যাগাইং শহরের উত্তর-পশ্চিমে। ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ব্যাপক প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।
ইউএসজিএস-এর প্রাথমিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, মিয়ানমারের এই ভূমিকম্পে ব্যাপক হতাহত এবং সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুর্যোগের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। মান্দালয় শহর ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে হতাহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এই শহরে ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষের বসবাস।
শনিবার সকালের দিকে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার জানিয়েছে, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তবে ইউএসজিএস-এর বিশ্লেষণে আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তাদের মতে, মিয়ানমারে আঘাত হানা এই স্মরণকালের ভয়াবহতম ভূমিকম্পে সম্ভাব্য প্রাণহানির সংখ্যা ১০ হাজার থেকে এক লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে। যদিও এই সংখ্যা এখনও নিশ্চিত নয়, তবে এর সত্য হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৩৫ শতাংশ।
ভূমিকম্পের ফলে দেশটিতে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইউএসজিএস। এই ক্ষতির পরিমাণ মিয়ানমারের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি)-কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে গত চার বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলন করছে গণতন্ত্রকামী ও স্বাধীনতাকামী বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী। সেনা শাসনের কবলে থাকা দেশটিতে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট বিরাজ করছে। গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমারে এই পরিস্থিতিতে উদ্ধার কার্যক্রম ও ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিপজ্জনক ফাটল:
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল)-এর জিওফিজিকাল অ্যান্ড ক্লাইম্যাট হ্যাজার্ড বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক বিল ম্যাকগুইয়ার বলেছেন, সম্ভবত প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানা এটিই সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প।
রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের কয়েক মিনিট পরেই দেশটিতে প্রথম আঘাত হানে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী আফটারশক। অধ্যাপক ম্যাকগুইয়ার সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক দিনে মিয়ানমারে আরও ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের (আইসিএল)-এর টেকটোনিক্স বিশেষজ্ঞ রেবেকা বেল ভূমিকম্পের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, মিয়ানমারের স্যাগাইং ফল্টের এক পার্শ্বের সঙ্গে অন্য পার্শ্বের ‘স্ট্রাইক-স্লিপ’ ঘটেছে। স্ট্রাইক-স্লিপের ক্ষেত্রে কোনো ফল্টের ওপরের দুটি ব্লক একে অপরের পাশ দিয়ে অনুভূমিকভাবে পিছলে যায়।
স্যাগাইং ফল্টের পশ্চিমে ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেটের অবস্থান। এই প্লেটের মুখে রয়েছে সানডা প্লেট, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ অংশ নিয়ে গঠিত। এই ফল্টটির অবস্থান এবং এর নড়াচড়া যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান আন্দ্রেয়াস ফল্টের মতোই।
বিশেষজ্ঞ রেবেকা বেল আরও জানান, স্যাগাইং ফল্টটি প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এটি একেবারে সরলরেখায় বিস্তৃত। ফল্ট সরল থাকার কারণে ভূমিকম্প একটি বৃহৎ অঞ্চলজুড়ে সংঘটিত হতে পারে। ফল্ট পিছলে যাওয়ার ক্ষেত্র যত বড় হয়, ভূমিকম্পের মাত্রা ও ব্যাপ্তি তত বেশি হয়।
এই ধরনের ভূমিকম্প “বিশেষ ধ্বংসাত্মক” হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন রেবেকা বেল। তিনি বলেন, মিয়ানমারের এই ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠের খুব বেশি গভীরে সংঘটিত হয়নি। যে কারণে ভূমিকম্পের শক্তি ভূপৃষ্ঠের জনবহুল অঞ্চলে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে এবং এর ফলে ভূপৃষ্ঠে ব্যাপক কম্পন সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র: এএফপি।