লোকসভায় ফিনান্স বিল ২০২৫: অনলাইন বিজ্ঞাপনের ওপর ইকুয়ালাইজেশন লেভি তুলে নেওয়ার প্রস্তাব, মার্কিন চাপের ফলস্বরূপ?

কেন্দ্রীয় সরকার সোমবার লোকসভায় ফিনান্স বিল ২০২৫-এ ৫৯টি সংশোধনীর মাধ্যমে অনলাইন বিজ্ঞাপনের ওপর আরোপিত ইকুয়ালাইজেশন লেভি বা ডিজিটাল কর (Equalisation Levy) তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপটি সম্ভবত আমেরিকার সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত দিতে পারে, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই করের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে আসছে।

ইকুয়ালাইজেশন লেভি: ইতিহাস এবং উদ্দেশ্য

ইকুয়ালাইজেশন লেভি প্রথম চালু হয়েছিল ২০১৬ সালের ১ জুন, যেখানে ভারতীয় বাজারে ব্যবসা না করা বিদেশি ডিজিটাল কোম্পানিগুলোর ওপর ৬ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হয়েছিল। গুগল, ফেসবুকের মতো বৈশ্বিক টেক জায়ান্টদের জন্য এই কর ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা ভারতে বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপন থেকে আয় করলেও দেশে স্থায়ী অফিস না থাকায় ঐতিহ্যবাহী কর ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারত না। এই করের উদ্দেশ্য ছিল ডিজিটাল অর্থনীতির সমতা বজায় রাখা এবং দেশীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা।

মার্কিন চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইকুয়ালাইজেশন লেভি তুলে নেওয়ার প্রস্তাবের পিছনে মার্কিন সরকারের চাপ বড় কারণ হতে পারে। আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে এই করের বিরোধিতা করেছে, দাবি করে যে এটি তাদের কোম্পানির ওপর অযৌক্তিকভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে। গত বছর মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (USTR) ভারতের বিরুদ্ধে বাণিজ্য শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিল, যদি এই কর অব্যাহত থাকে। এই পরিস্থিতি মাথায় রেখে ভারত-মার্কিন সম্পর্কের উত্তেজনা কমাতে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সুরক্ষিত রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

পশ্চিমবঙ্গের ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ছোট ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কলকাতার একজন ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, “এই লেভি তুলে নিলে গুগল ও ফেসবুকের মতো কোম্পানিগুলোর খরচ কমবে, কিন্তু আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এটি প্রতিযোগিতা আরও কঠিন করে তুলতে পারে।” অন্যদিকে, অনেকেই মনে করছেন, এই পদক্ষেপটি ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করবে, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য লাভজনক হতে পারে।

বিরোধিতাও রয়েছে

বিরোধী দলগুলো এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে। তাদের দাবি, ইকুয়ালাইজেশন লেভি তুলে নেওয়ার ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি হবে। ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরে এই লেভি থেকে সরকার প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা আয় করেছিল, যা দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করা হতে পারত। বিরোধীরা বলছেন, “আমেরিকার চাপের কাছে নত হওয়া মানে নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া।”

ভবিষ্যত প্রভাব এবং বিশ্লেষণ

এই প্রস্তাব যদি গৃহীত হয়, তাহলে ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিদেশি টেক কোম্পানিগুলিকে ভারতীয় বাজারে আরও বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে, তবে দেশীয় কোম্পানিগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরকারকে বিকল্প রাজস্ব উৎস খুঁজতে হতে পারে। একজন অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন, “এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। যদি ভারত আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ভালো রাখতে চায়, তবে এই ধরনের ছাড় দিতে হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।”

একটি মাইলফলক পদক্ষেপ

ইকুয়ালাইজেশন লেভি তুলে নেওয়ার প্রস্তাব ফিনান্স বিল ২০২৫-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিক নির্দেশ করতে পারে। এই প্রস্তাবটি লোকসভায় পাস হলে, ভারতের ডিজিটাল ল্যান্ডস্কেপে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সে দিকেই নজর থাকবে সবার।