“সরকারি হাসপাতালে ৮ ঘণ্টা ডিউটি করতেই হবে”-ডাক্তারদের বড় নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রী মমতার

সরকারি হাসপাতালে পরিষেবা কম দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাক্টিসে বেশি সময় দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠছিল চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে কড়া বার্তা দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার ধনধান্য স্টেডিয়ামে চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন, “সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা ডিউটি করতেই হবে। তারপর প্রাইভেট প্র্যাক্টিসে যত খুশি সময় দিন।”

মমতা বলেন, “সিনিয়র ডাক্তারদের অনুরোধ, কথায় কথায় সব দায়িত্ব জুনিয়রদের হাতে তুলে দেবেন না। সিজার বা হার্ট অপারেশনের মতো জটিল কাজ জুনিয়রদের উপর ছেড়ে দেওয়া চলবে না। আপনারা ৮ ঘণ্টা সরকারি হাসপাতালে পরিষেবা দিন। প্রাইভেটের জরুরি রোগী থাকলে তাঁদের সরকারি হাসপাতালে ডেকে নিন। সেখানে তো সব সুবিধাই আছে। সরকারি হাসপাতালের পরিষেবাটা যদি দেন, আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। মানুষ চিরকাল থাকে না, তাঁদের কাজ মনে থাকে। আপনাদেরও মানুষ মনে রাখবে।”

প্রাইভেট প্র্যাক্টিসের সীমা বাড়ল
এতদিন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাঁদের কর্মস্থল থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রাইভেট প্র্যাক্টিস করতে পারতেন। এই সীমা আরও ১০ কিলোমিটার বাড়িয়ে মমতা ঘোষণা করেন, “এখন থেকে ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রাইভেট প্র্যাক্টিস করতে পারবেন চিকিৎসকরা।” তবে সরকারি হাসপাতালে ন্যূনতম ৮ ঘণ্টা পরিষেবার শর্তে এই ছাড় মিলবে বলে জানান তিনি।

বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা
এদিনের বৈঠকে চিকিৎসকদের জন্য বেতন বৃদ্ধির বড় ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ইন্টার্ন, হাউস স্টাফ, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি (পিজিটি) ও পিজিডিটি ট্রেনিদের ভাতা ১০ হাজার টাকা করে বাড়ানো হবে। সিনিয়র রেসিডেন্টদের বেতন সর্বস্তরে ১৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি পাবে। ফলে ডিপ্লোমাধারী সিনিয়রদের বেতন ৬৫ হাজার থেকে বেড়ে হবে ৮০ হাজার টাকা। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সিনিয়রদের বেতন ৭০ হাজার থেকে বেড়ে ৮৫ হাজার এবং পোস্ট ডক্টরেট সিনিয়রদের বেতন ৮৫ হাজার থেকে বেড়ে হবে ১ লক্ষ টাকা।” এই ঘোষণা চিকিৎসকদের মধ্যে উৎসাহের সঞ্চার করেছে।

স্বাস্থ্য পরিষেবার গর্ব
রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার সাফল্য তুলে ধরে মমতা বলেন, “স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ৯ কোটি মানুষ উপকৃত হয়েছে। চিকিৎসকদের অবদান এতে অপরিসীম। আমাদের আমলে দেশের সেরা হাসপাতাল পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে। ১৩,৫০০-এর বেশি সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ৪০ হাজার বেড বেড়েছে।” তিনি উল্লেখ করেন, ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরে ইঞ্জেকশন প্রয়োগে বাংলা দেশে এক নম্বরে রয়েছে। তবে জাল ওষুধের সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “জাল ভিডিওর মতো জাল ওষুধও বেরোচ্ছে। তিন মাস পরপর ওষুধ ও ইঞ্জেকশনের এক্সপায়ারি ডেট দেখতে হবে।”

নিরাপত্তা ও পরিষেবায় নতুন উদ্যোগ
হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য প্রাক্তন পুলিশকর্মীদের নিয়োগের পরামর্শ দেন মমতা। পাশাপাশি, মোবাইল ভ্যান বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে বলেন, “গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে এটা জরুরি।” এছাড়া, টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের সেবার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান
মুখ্যমন্ত্রীর এই বৈঠক ও নির্দেশনা সরকারি হাসপাতালের পরিষেবার মান বাড়ানোর দিকে একটি বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মমতার কথায়, “আপনারা সরকারি হাসপাতালে সময় দিলে সাধারণ মানুষের উপকার হবে। এটাই আমাদের লক্ষ্য।” বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি দায়িত্বশীলতার এই বার্তা চিকিৎসক সমাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।