বিশেষ: আপনি কি আদৌ মধ্যবিত্ত? কত টাকা রোজগারে কারা কোন শ্রেণীতে? জানুন বিস্তারিত

ভারতের অর্থনৈতিক ভিত্তি যাদের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। দেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ এই শ্রেণিতে পড়ে, এবং তারা সবচেয়ে বেশি কেনাকাটা, পরিষেবা গ্রহণ, এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। তবে সাম্প্রতিককালে, ধনী শ্রেণি আরও ধনী হচ্ছে, এবং দরিদ্র শ্রেণি আরও দরিদ্র হয়ে উঠছে—এমন এক পরিস্থিতিতে, মধ্যবিত্তদের অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মধ্যবিত্ত শ্রেণির গুরুত্ব: রাজনীতি ও বাজেটের লক্ষ্য

প্রতিটি বাজেট এবং নির্বাচনী প্রচারনায় মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, কারণ এই শ্রেণি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। দিল্লির মতো শহরে এই সংখ্যা ৩০ শতাংশেরও বেশি। ফলে, সব রাজনৈতিক দলই মধ্যবিত্তদের টার্গেট করে, এবং এই শ্রেণি সম্পর্কে তাদের প্রতিশ্রুতি ভোটের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মধ্যবিত্তদের উপর বাড়তি চাপ

গত এক দশকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপর আয়কর এবং অন্যান্য করের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের আয় তেমন বৃদ্ধি পায়নি, বরং খরচের বোঝা ক্রমশ বাড়ছে। ব্যয়ের মধ্যে বাড়তি চাপের কারণ হিসেবে বাড়তি জীবনযাত্রার খরচ এবং ইনফ্লেশনকে দায়ী করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যবিত্তের এই চাপের মধ্যে তাদের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতি এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে।

মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা এবং আয় পরিসীমা

মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা বেশ কঠিন, কারণ এটি শহর, গ্রাম, এবং মফস্বল এলাকার জীবনযাত্রার খরচের ওপর নির্ভরশীল। তবে কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁদের বার্ষিক আয় ২.৫ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকার মধ্যে, তাঁদের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে, মাস্টারকার্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১.৫১ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকার বার্ষিক আয় থাকলে সেই ব্যক্তি মধ্যবিত্ত হিসেবে চিহ্নিত হন।

এছাড়া, একাধিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, যেসব পরিবারে বার্ষিক আয় ৫-৩০ লক্ষ টাকার মধ্যে, তারা প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে পড়ে। তবে, পরিবারে একাধিক উপার্জনকারী সদস্য থাকলে, সেই পরিবারের আয় আরও বেশি হতে পারে, যা তাদের অবস্থানকে বিভিন্ন শ্রেণিতে স্থানান্তরিত করতে পারে।

ধনী শ্রেণির বৃদ্ধি এবং উচ্চবিত্তের সংখ্যা

গোল্ডম্যান শ্যাক্সের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে উচ্চবিত্ত বা ধনী শ্রেণির সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। এঁদের বার্ষিক আয় ৯-১২ লক্ষ টাকার বেশি, এবং এই শ্রেণি দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মানের ঊর্ধ্বগতি অবশ্যই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে, কিন্তু তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং মধ্যবিত্তের চাপের মধ্যে একটি ফারাক তৈরি হয়েছে।

মধ্যবিত্ত: দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড

মধ্যবিত্ত শ্রেণি, তাদের করের মাধ্যমে, ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তারা যে পরিমাণ খরচ করেন, তার মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি প্রতিফলিত হয়। তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মানের উন্নতি দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে ওঠে। ফলে, সরকারের দায়িত্ব হয়ে ওঠে এই শ্রেণির উন্নতির জন্য সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করা।

বর্তমানে, ভারতীয় অর্থনীতি একটি মাইক্রো-লেভেল চাপের মুখে পড়েছে, যেখানে একদিকে ধনী শ্রেণির বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে দরিদ্র শ্রেণির অবনতির প্রভাব পড়ে চলেছে। মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রার উন্নতি এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সঠিক নীতিমালার প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে তারা নিজেদের জীবনে আরও উন্নতি করতে পারেন, এবং দেশীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।