উৎসব, কার্নিভাল সবই হচ্ছে, দুর্গাপুরে বইমেলা কেন নেই? হতাশ বইপ্রেমীরা

শীত প্রায় শেষের দিকে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা শহর এমনকি মহকুমা শহরগুলোতেও বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে এবং সর্বত্রই বইপ্রেমীদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এর ব্যতিক্রম দুর্গাপুর। ২০২০ সালে শেষবারের মতো এই শিল্প শহরে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর কেটে গেছে পাঁচটি বছর, কিন্তু দুর্গাপুরের মানুষ বইমেলার আনন্দ থেকে বঞ্চিত।

অথচ দুর্গাপুরে মেলার আয়োজন কম হয় না। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিভিন্ন মেলা ও খেলার আয়োজন করা হয়। কল্পতরু মেলা, রথের মেলার সাথে কয়েকটি বইয়ের দোকান জুড়ে দিয়ে কোনোমতে বইমেলা নাম দেওয়া হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দুর্গাপুরে কোনো полноцен বইমেলা হয় না।

প্রাক্তন মেয়র দিলীপ অগস্তি মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর বইমেলা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি একপ্রকার চ্যালেঞ্জ নিয়ে খুব অল্প সময়ের নোটিশে সিধো কানহো ইন্ডোর স্টেডিয়ামের বাইরে বইমেলার আয়োজন করেছিলেন, যা বেশ সাড়া ফেলেছিল। পরের বছর, ২০২০ সালেও বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রাক্তন মেয়রের কণ্ঠে আক্ষেপের সুর শোনা যায়। তিনি বলেন, “দ্বিতীয় বছরে এক কোটি টাকারও বেশি বই বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু এখন আর দুর্গাপুরে বইমেলা হয় না। এটা খুবই খারাপ লাগে। পাশের শহর রানীগঞ্জ, আসানসোল, মেজিয়াতেও বইমেলা হয়, তাহলে দুর্গাপুরে কেন হবে না? এখন আমি কোনো পদে নেই, তবে কেউ যদি বইমেলা করার উদ্যোগ নেয়, তাহলে আমি সবরকমভাবে সহযোগিতা করব।”

সম্প্রতি পূর্ব বর্ধমানের কালনায় বইমেলার উদ্বোধনে এসে প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “মানুষ বই পড়ছে না, এই কথাটা আমি বিশ্বাস করি না। বরং আগে মানুষ কম পড়ত, এখন অনেক বেশি পড়ছে। মানুষের কাছ থেকে যে সাড়া পাই, তাতেই এটা বোঝা যায়।” ২০১৯ সালে দুর্গাপুর পুরসভার উদ্যোগে আয়োজিত বইমেলার উদ্বোধনে এসেও তিনি একই মন্তব্য করেছিলেন। এরপর পুরসভা প্রতি বছর বইমেলা আয়োজনের ঘোষণা করেছিল।

বইমেলা না হওয়ায় দুর্গাপুরের বাসিন্দা ও রসায়নের শিক্ষক নরুল হক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “কত চেষ্টা করে দু’বছর বইমেলা করেছিলাম। কলকাতার অনেক নামী প্রকাশনা সংস্থা সেই মেলায় অংশ নিয়েছিল। এখন দুর্গাপুরে বইমেলাই হয় না, এটা খুবই হতাশাজনক।”

দুর্গাপুরের বাসিন্দা ও লেখক রণজিৎ গুহর মনে এখনও সেই বইমেলার স্মৃতি টাটকা। তিনি প্রশ্ন করেন, “দুর্গাপুর বইমেলায় দারুণ সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। এখন আমাদের কলকাতা বইমেলার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। দুর্গাপুরে উৎসব হচ্ছে, স্পোর্টস কার্নিভাল হচ্ছে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেলা হচ্ছে, তাহলে বইমেলা কেন হবে না?”

বইপ্রেমীরাও হতাশ। স্টিল টাউনশিপের বাসিন্দা অরিন্দম দত্তের কথায়, “দুর্গাপুর বইমেলায় নামী প্রকাশনা সংস্থাগুলি অংশ নিয়েছিল। সেই দু’বছর আমাদের কলকাতা বইমেলায় যেতে হয়নি। আমাদের এত বড় একটা শহর, অথচ এখানে বইমেলাই হয় না, এটা ভাবতেও খারাপ লাগে।”

দুর্গাপুরে কেন বইমেলা করা যাচ্ছে না, এই প্রশ্নের উত্তরে এডিডিএ (আসানসোল-দুর্গাপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি)-র চেয়ারম্যান কবি দত্ত বলেন, “এখন তো ডিজিটালের যুগ। বাচ্চারা এখন মোবাইলেই সব পড়ছে। বইয়ের চাহিদা যদি থাকে, তাহলে বইমেলা করতে কোনো অসুবিধা নেই।” পুরসভার মুখ্য প্রশাসক অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের মতে, “শহরে অনেক ধরনের মেলা হচ্ছে। মানুষ যদি বইমেলা চায়, তাহলে চেষ্টা করা যেতে পারে।”

এই প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট যে দুর্গাপুরের বইপ্রেমীরা একটি পূর্ণাঙ্গ বইমেলার অভাব বোধ করছেন এবং কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের দাবি জানাচ্ছেন।