“রাস্তায় গাড়িগুলো এবার নিজেরা ‘কথা’ বলবে!”-পথ দুর্ঘটনা কমাতে বিরাট পদক্ষেপ কেন্দ্রের

ভারতে ক্রমবর্ধমান পথ দুর্ঘটনার গ্রাফ রুখতে এবার এক অত্যন্ত অভিনব ও যুগান্তকারী পদক্ষেপের পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় সরকার। গত বছরগুলিতে দেশে পথ দুর্ঘটনায় লাগাতার প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ওভার স্পিডিং, ট্রাফিক নিয়ম না মানা কিংবা যান্ত্রিক গোলযোগের মতো কারণে প্রতিদিন শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে রাস্তায় চলতে থাকা গাড়িগুলি যদি নিজেরা একে অপরের সঙ্গে ‘কথা’ বলতে পারত, তবে হয়তো বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো—এই ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিতে এবার রাস্তায় চলা প্রতিটি গাড়িতে বিশেষ কমিউনিকেশন সিস্টেম ইনস্টল করার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র।
নয়া এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে V2V (Vehicle-to-Vehicle Communication) System। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রকের তরফে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে।
কবে থেকে লাগু হচ্ছে এই নিয়ম?
পরিবহণ মন্ত্রকের প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন Connected Vehicle Technology বা V2V সিস্টেমটি ২০২৮ সালের ১ অক্টোবরের পরে উৎপাদিত দেশের সমস্ত নতুন গাড়িতে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। নতুন AIS-230 স্ট্যান্ডার্ড মেনেই এই সিস্টেমটি প্রস্তুত ও ইনস্টল করতে হবে।
কোন কোন গাড়িতে এই সিস্টেম বাধ্যতামূলক?
প্রস্তাবিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, L, M এবং N—এই তিন প্রধান ক্যাটিগরির সমস্ত গাড়িতেই এই টেকনোলজি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে:
-
L ক্যাটিগরি: দুই এবং তিন চাকার গাড়ি (এর মধ্যে চার চাকা বিশিষ্ট কোয়াড্রিসাইকেল বা Quadricycle-ও অন্তর্ভুক্ত)।
-
M ক্যাটিগরি: সমস্ত ধরণের প্যাসেঞ্জার ভেহিকেল বা যাত্রী পরিবাহী গাড়ি।
-
N ক্যাটিগরি: সমস্ত ধরণের পণ্যবাহী বাণিজ্যিক যান।
কী এই V2V Communication System এবং এটি কীভাবে কাজ করবে?
V2V কমিউনিকেশন হলো এমন এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, যার সাহায্যে একজন চালক তাঁর আশেপাশের অন্যান্য গাড়ির গতিবেগ (Speed), সঠিক অবস্থান (Position), দিক (Direction) এবং অ্যাক্সিলারেশন সংক্রান্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রিয়েল-টাইমে জানতে পারবেন। এছাড়া আশপাশের কোনো গাড়ি হঠাৎ ইমারজেন্সি ব্রেক কষলে, কোনো সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলে কিংবা পিছন থেকে অ্যাম্বুল্যান্স বা দমকলের মতো জরুরি পরিষেবার গাড়ি আসলেও এই সিস্টেম চালককে আগে থেকেই সতর্ক করে দেবে।
এই প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত আধুনিক। V2V সিস্টেমে যুক্ত প্রতিটি গাড়িতে থাকবে একটি বিশেষ অনবোর্ড ইউনিট, যার মধ্যে রেডিও চিপ ও অন্যান্য সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ ইনস্টল করা থাকবে। এই ইউনিটের মাধ্যমেই গাড়ির চাকার গতি, স্টিয়ারিংয়ের অ্যাঙ্গেল এবং ব্রেকিং সেন্সরের সমস্ত ডেটা সংগৃহীত হয়। পরবর্তীতে ৫.৮৭৫ GHz থেকে ৫.৯২৫ GHz ফ্রিকোয়েন্সির বিশেষ রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে সেই তথ্য আশেপাশের অন্যান্য গাড়িতে পৌঁছে যায়।
এই প্রযুক্তির বিশেষ কার্যকারিতা
পরিবহণ মন্ত্রকের তরফে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই প্রযুক্তিটি চালকের স্বাভাবিক দৃষ্টিসীমার বাইরে গিয়েও (Line-of-sight ছাড়িয়ে) অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজ করতে সক্ষম। গাড়িতে ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত ADAS (Advanced Driving Assistance Systems) এবং অন্যান্য আধুনিক সেফটি অ্যাপ্লিকেশনের পরিপূরক বা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে এই V2V সিস্টেম। দেশের ক্রমবর্ধমান পথ দুর্ঘটনার হার কমাতে এবং সড়ক নিরাপত্তাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।