মাথাপিছু ১৩টি চূড়া আর মানবদেহের গোপন নকশা! হুগলির হংসেশ্বরী মন্দিরের আধ্যাত্মিক রহস্য জানলে শিহরিত হবেন

বাংলার আর পাঁচটা গতানুগতিক উপাসনালয়ের থেকে এই মন্দিরের মূল গঠন ও মাহাত্ম্য সম্পূর্ণ আলাদা। এটি সাধারণ কোনো মন্দির নয়, হুগলির বাঁশবেড়িয়ার এই ঐতিহাসিক মন্দিরের প্রতিটি খোদাই করা খাঁজে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন তান্ত্রিক রহস্য এবং মানবদেহের ষটচক্র জাগরণের অনন্য সোপান।
এখানে মা চতুর্ভুজা ও নীলবর্ণা। দেবীমূর্তির এক হাতে বরাভয় এবং অন্য হাতে তরবারি। মহাকালের হৃদয় থেকে জন্ম নেওয়া রক্তলাল পদ্মে দেবীর অধিষ্ঠান। তিনি কালী, তবে এই মন্দিরে তিনি বিরাজ করছেন কুলকুণ্ডলিনী রূপে। বলা চলে, হংসেশ্বরী মন্দির কেবল একটি দেবস্থান নয়, এটি যেন এক জীবন্ত যোগমার্গ। কথিত আছে, স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণদেবও এই আধ্যাত্মিক অনুভূতির টানে একাধিকবার এই মন্দিরে ছুটে এসেছিলেন।
বিলেত যাত্রা বাতিল করে মন্দির গড়ার ইতিহাস
আজ থেকে প্রায় ২১০ বছর আগের কথা। বাঁশবেড়িয়ার তদানিন্তন রাজা নৃসিংহদেব রায় কাশীতে গিয়ে বহু বছর গভীর তন্ত্র সাধনা করেন। সাধনালব্ধ জ্ঞান নিয়ে দেশে ফিরে আসার পর তাঁর আর জাগতিক বিষয়-সম্পত্তিতে মন টেকেনি। এমনকি পূর্বপরিকল্পিত বিলেত যাওয়ার সিদ্ধান্তও চিরতরে বাতিল করে দেন তিনি।
নিজের সমস্ত মনোযোগ ও আধ্যাত্মিক দর্শনকে বাস্তব রূপ দিতে তিনি এক নজিরবিহীন মন্দির গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে রাজা নৃসিংহদেব স্বচক্ষে এই মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ দেখে যেতে পারেননি। ১৮০২ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর ধর্মপ্রাণা রানি শঙ্করী দেবী হাল ধরেন। তৎকালীন সময়ে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা বিপুল অর্থ ব্যয়ে তিনি মন্দিরের কাজ শেষ করেন। পরবর্তীতে ১৮১৪ সালে সাধারণ ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের জন্য মন্দিরের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
মানবদেহের নকশায় তৈরি ৭০ ফুট উঁচু মন্দির: কী সেই রহস্য?
তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, মানবদেহের সুষুম্নাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যে সাতটি প্রধান শক্তিচক্র রয়েছে, হংসেশ্বরী মন্দিরের পুরো পরিকাঠামোটি ঠিক সেই আদলেই গড়া।
১৩টি চূড়া ও ৬টি তলা: ৭০ ফুট উঁচু এই ৬ তলা মন্দিরে মোট ১৩টি চূড়া রয়েছে, যা সাধারণ মন্দির স্থাপত্যে বিরল।
গর্ভগৃহ ও মূল মূর্তি: মন্দিরের গর্ভগৃহটিকে মানবদেহের ‘মূলাধার চক্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেখানে একটি বিশেষ পাথরের বেদিতে খোদাই করা অষ্টদল পদ্মের উপর শায়িত রয়েছেন ভগবান শিব। আর তাঁর নাভি থেকে গজিয়ে ওঠা ১২টি পাপড়ির রক্তলাল পদ্মে পদ্মাসনে বিরাজ করছেন স্বয়ং মা হংসেশ্বরী।
গোপন সিঁড়ি ও পাঁচ নাড়ি: মানবদেহের পাঁচটি প্রধান নাড়ির প্রতীক হিসেবে মন্দিরে ওঠার পাঁচটি বিশেষ সিঁড়ি রয়েছে।
১২টি শিবলিঙ্গ ও গোলকধাঁধা: দেবীর মূর্তির পাশাপাশি মন্দিরের তিন তলায় কষ্টিপাথরের ১২টি শিবলিঙ্গ স্থাপন করা আছে।
গর্ভগৃহ থেকে মন্দিরের চূড়া পর্যন্ত ভিতর দিয়ে উঠে গেছে অসংখ্য গোপন সিঁড়ি ও সংযোগপথ। সাধকদের মতে, গুরুর প্রত্যক্ষ নির্দেশ ছাড়া এই যৌগিক গোলকধাঁধা থেকে সহজে মোক্ষের পথ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
‘হংসেশ্বরী’ নামের তান্ত্রিক তাৎপর্য
তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত রয়েছে, সাধারণ মানুষের নিঃশ্বাসের সময় ‘হং’ এবং প্রশ্বাসের সময় ‘সঃ’ শব্দ নির্গত হয়। এই অবিরত ‘হংস’ বা অজপা মন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবীই হলেন মা হংসেশ্বরী।
সারা বছর ধরে মা এখানে তাঁর শান্তরূপে পূজিতা হন। তবে বছরের একটি মাত্র রাতে ঘটে বিশেষ ব্যতিক্রম। দীপান্বিতা অমাবস্যা অর্থাৎ কালীপুজোর রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য দেবীকে অলৌকিক রাজবেশে সুসজ্জিত করা হয়। ফুল ও বহুমূল্য অলংকারে মোড়া দেবীর সেই রাজকীয় রূপ দর্শন করতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় জমান অগণিত ভক্ত। ভোর চারটে বাজলেই মা আবার তাঁর চিরচেনা শান্তরূপে ফিরে যান। এই মন্দির প্রাঙ্গণেই পাশেই রয়েছে অপর এক ঐতিহাসিক অনন্ত বাসুদেব মন্দির।
উইকেন্ড ট্রিপে কীভাবে যাবেন?
কলকাতা বা তার আশেপাশের অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য হংসেশ্বরী মন্দির একটি অত্যন্ত নিখুঁত উইকেন্ড ডেস্টিনেশন।
গাড়িতে রোড ট্রিপ: কলকাতা থেকে দিল্লি রোড ধরে নিজস্ব গাড়িতে মাত্র ৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেই এখানে পৌঁছে যাওয়া যায়।
ট্রেণে আসা- যাওয়া: হাওড়া-কাটোয়া শাখায় ট্রেনে চেপে সরাসরি বাঁশবেড়িয়া স্টেশনে নেমে অটো বা টোটো নেওয়া যায়। এছাড়া ব্যান্ডেল জংশন স্টেশন থেকেও খুব সহজে গাড়ি বা অটো পাওয়া যায়।
দর্শনের সময়সূচি: প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ১২:৩০ এবং বিকেল ৪টে থেকে সন্ধে ৭টা পর্যন্ত মন্দিরের গেট খোলা থাকে।
ভোগের প্রসাদ: আপনি যদি দুপুরের মহাপ্রসাদ বা ভোগের স্বাদ নিতে চান, তবে বেলা ১২:৩০-এর আগেই মন্দির কাউন্টার থেকে ভোগের কুপন সংগ্রহ করে নিতে হবে।