“আমার গান নয়, এ তো শেকড়ের টান!” শাহরুখের ‘কিং’-এর সঙ্গে নিজের গানের সুর মেলাতেই বিস্ফোরক মৌসুমী ভৌমিক

বলিউডের বাদশা শাহরুখ খানের আসন্ন ছবি ‘কিং’-এর নতুন গান নিয়ে এবার শোরগোল পড়ে গেল নেটপাড়ায়। এই ছবির সদ্য প্রকাশিত ‘তু মিল যায়ে’ গানটির সুরের সঙ্গে বাংলার বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের জনপ্রিয় গান ‘আমি শুনেছি সেদিন’-এর শুরুর অংশের সুরের মিল খুঁজে পেয়েছেন এক নেটিজেন। আর তাতেই শুরু হয়েছে জল্পনা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরাসরি মৌসুমীকে ট্যাগ করা হয়। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে শিল্পীদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেলেও, এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও পরিপক্ব পথ বেছে নিলেন মৌসুমী। কোনো রকম বিরূপ মন্তব্য না করে সঙ্গীতের ব্যাকরণ, সুরের বহমান ধারা এবং আত্মস্থ করা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এক দারুণ যুক্তিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তিনি।

কী বললেন মৌসুমী ভৌমিক?
অনুরাগীর সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তরে মৌসুমী স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তাঁর নিজের কান বা চোখে নতুন গানটির সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির বিশেষ কোনো মিল ধরা পড়েনি। তাঁর মতে, সঙ্গীতের মূল ভিত্তি তো সেই সাতটি স্বরই। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা যুগের পর যুগ এই সাতটি স্বর নিয়েই কাজ করে চলেছেন। ফলে বিভিন্ন সুরের বিন্যাসে বা ব্যবহারে মাঝে মাঝে সামান্য সাদৃশ্য থাকাটা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কোনো একটি পরিচিত গানের সঙ্গে নতুন কোনো সুরের সামান্য মিল পেলেই তাকে সরাসরি ‘অনুকরণ’ বা ‘নকল’ বলে দেগে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। শ্রোতাদের মনে এমন ভাবনা আসতেই পারে, কিন্তু সেই অনুভূতির সঙ্গে বাস্তব সৃষ্টির সবসময় মেলবন্ধন থাকে না।

নিজের জনপ্রিয় গান ‘আমি শুনেছি সেদিন’-এর সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শিল্পী স্মরণ করেন বাংলার প্রাচীন লোকসঙ্গীত ও পাঁচালীর সুররীতির কথা। তাঁর মতে, যে সুরটিকে অনেকে একান্ত অভিনব বা মৌলিক বলে মনে করেন, তার শেকড় আসলে বহু পুরনো লোকসুরের ধারার মধ্যেই প্রোথিত রয়েছে। তবে সেই পুরনো প্রভাবের মাঝে তাঁর গান থমকে থাকেনি, বরং একটি পরিচিত সুরের বীজ থেকেই কালক্রমে তা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছে। তিনি সচেতনভাবে পাঁচালীর কথা মাথায় রেখে সুর তৈরি করেননি, বরং দীর্ঘদিনের শোনা ও আত্মস্থ করা লোকসঙ্গীতের অভিজ্ঞতাই তাঁর অজান্তে অবচেতনে এই সৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছিল।

সুরের আদানপ্রদান ও এক অনন্য অভিজ্ঞতা
এই প্রসঙ্গে নিজের জীবনের আরও একটি চমৎকার স্মৃতির কথা ভাগ করে নিয়েছেন এই প্রখ্যাত শিল্পী। তিনি জানান, অতীতে তাঁর একটি গান শুনে এক বন্ধু নাকি বিখ্যাত মার্কিন লোকসঙ্গীতশিল্পী জোন বায়েজের (Joan Baez) গায়কীর কথা স্মরণ করেছিলেন। অথচ জোন বায়েজের কথা মাথায় রেখে তিনি সেই গান তৈরিই করেননি। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর উপলব্ধি যে, একজন শিল্পীর সৃষ্টির মধ্যে অজান্তেই নানা পরিচিত সুর, কণ্ঠ কিংবা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সুক্ষ্ম ছাপ রয়ে যেতে পারে। এই প্রভাব কখনো সচেতনভাবে ঘটে, আবার কখনো সম্পূর্ণ অবচেতনে তৈরি হয়।

তবে নিজের উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের পাশাপাশি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিয়েছেন মৌসুমী। তাঁর মতে, যদি কেউ সচেতনভাবে বা অসৎ উদ্দেশ্যে অন্যের সৃষ্টি অবিকল নকল করে নিজের নামে চালিয়ে দেন, তবে অবশ্যই সেই চুরির বিরুদ্ধে জোরালো প্রশ্ন তোলা উচিত। কিন্তু নিছক সুরের সাদৃশ্য বা মিলের ভিত্তিতে অন্ধের মতো কাউকে অভিযুক্ত করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং সঙ্গীতের এই পারস্পরিক আদানপ্রদানকে আরও পরিপক্ব ও বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করা প্রয়োজন।

সুরের বিতর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতিতে মৌসুমী ভৌমিকের এমন সংযত, মার্জিত ও যুক্তিনির্ভর প্রতিক্রিয়া নেটদুনিয়ায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। নিজের সৃষ্টির প্রতি অবিচল আস্থা রেখেই অন্যের শোনার অনুভূতিকে সম্মান জানানো এবং সঙ্গীতের বহমান ধারাকে সহজভাবে মেনে নেওয়ার এই মানসিকতাই আপাতত সোশ্যালে মন জয় করে নিয়েছে নেটিজেনদের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *