দীপাবলির সকালে কেন গায়ে তেল মাখেন কোটি কোটি মানুষ? নেপথ্যের চমকপ্রদ পৌরাণিক রহস্য ফাঁস!

পাঁচ দিনব্যাপী দীপাবলি উৎসবের দ্বিতীয় দিনটি পালিত হয় ছোট দীপাবলি, নরক চতুর্দশী, কালী চৌদাস কিংবা রূপ চৌদাস হিসেবে। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত এই উৎসবে মূল দীপাবলির আনন্দের আগে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, প্রদীপ জ্বালানো, মিষ্টি তৈরি এবং গায়ে তেল মাখার এক বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। যাকে আয়ুর্বেদ ও ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় ‘অভ্যঙ্গ স্নান’ (Abhyanga Snan)।

অঞ্চলভেদে এই প্রথার আচার-আচরণে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এবং পৌরাণিক গুরুত্ব প্রায় সর্বত্রই এক। ধর্মীয় বিশ্বাস, শ্রীকৃষ্ণের অসুর বধের কাহিনী, নতুন শুরুর বার্তা থেকে শুরু করে শীতের আগে ত্বক ও জয়েন্টের সুরক্ষায় তেল মাখার এই অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেন রয়েছে, তা জেনে নেওয়া যাক।

ছোট দীপাবলিতে কেন তেল মাখা হয়?
১. দেবী লক্ষ্মী ও গঙ্গার আশীর্বাদ:
বিশ্বাস করা হয়, ছোট দীপাবলির এই বিশেষ দিনে তেলের মধ্যে মা লক্ষ্মী এবং জলের মধ্যে স্বয়ং দেবী গঙ্গা অবস্থান করেন। তাই তিলের তেল দিয়ে এই স্নানকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। এই পবিত্র স্নান অনেকটা পবিত্র গঙ্গায় ডুব দেওয়ার সমতুল্য এবং এটি পরিবারে সৌভাগ্য, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে বলে বিশ্বাস।

২. নরকাসুরের বিরুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের বিজয়:
এই আচারটি মূলত অসুর নরকাসুরের ওপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ঐতিহাসিক বিজয়কে স্মরণ করায়, যেখানে দেবী সত্যভামার অবদানকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, যুদ্ধের পর রক্ত ও ময়লা ধুয়ে ফেলতে শ্রীকৃষ্ণ তিলে তেল মেখে স্নান করেছিলেন। এই প্রথাটি মূলত জীবন থেকে সমস্ত অশুভ শক্তি, নেতিবাচকতা এবং অহংকার দূর করার প্রতীক।

৩. নতুন শুরুর বার্তা:
পুরোনো বছরের সমস্ত ক্লান্তি, ধুলোবালি, রাগ, অহংকার এবং কষ্ট ধুয়ে মুছে নতুনভাবে জীবন শুরু করার এক প্রতীকী মাধ্যম হলো এই স্নান। এর মাধ্যমে শরীর ও মনকে পবিত্র করে মূল দীপাবলির দিন মা লক্ষ্মীকে বরণ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

৪. শীতের মরসুমে আয়ুর্বেদিক উপকারিতা:
এই স্নানের জন্য মূলত হালকা গরম তিলের তেল ব্যবহার করা হয় এবং এর পরে উপটান বা শিকাকাইয়ের মতো ভেষজ স্ক্রাব ব্যবহার করা হয়। শীতকাল আসন্ন হওয়ার কারণে এই তেল মালিশ শুষ্ক ত্বককে পুষ্টি জোগায় এবং রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে পেশী ও জয়েন্টের আড়ষ্টতা দূর করতে দারুণ সাহায্য করে।

বিভিন্ন অঞ্চলে কীভাবে পালিত হয় এই তেল স্নানের প্রথা?
মহারাষ্ট্র ও গোয়া: এখানে সূর্যোদয়ের আগেই পরিবারগুলি ‘অভ্যঙ্গ স্নান’ সম্পন্ন করে। স্নানের পর বাড়ির ছোট সদস্যরা বাম পায়ের গোড়ালি দিয়ে ‘করিত’ নামক একটি ছোট তিতা ফল পিষে ফেলেন, যা নরকাসুর বধের প্রতীকী উদযাপন।

তামিলনাড়ু ও দক্ষিণ ভারত: দক্ষিণ ভারতে এই তেল স্নান ‘গঙ্গা স্নান’ নামে পরিচিত এবং এটি মূল দীপাবলির সকালেই পালিত হয়। পরিবারের প্রবীণরা কনিষ্ঠ সদস্যদের মাথায় উষ্ণ তিলের তেল (যা স্থানীয় ভাষায় ‘নল্লেন্নাই’ বলা হয়) মালিশ করে দেন এবং এরপর তারা শিকাকাই বা ডাল বাটা দিয়ে স্নান করেন।

উত্তর ভারত: উত্তর ভারতে দিনটি ছোট দীপাবলি বা নরক চতুর্দশী হিসেবে পরিচিত। মূল উৎসবের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মানুষ সূর্যোদয়ের আগেই তেল ও উপটান মেখে স্নান সেরে উৎসবের প্রথম প্রদীপগুলি প্রজ্জ্বলন করেন।

আঞ্চলিক বৈচিত্র্য যাই হোক না কেন, ছোট দীপাবলির উদযাপনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো এই ঐতিহ্যবাহী তেল স্নান। ধর্মীয় বিশ্বাস, পৌরাণিক ইতিহাস এবং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরের যত্নের এক অপূর্ব মেলবন্ধনই এই প্রাচীন প্রথাকে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *