সমুদ্রের গভীরে মহাপ্রলয়! আগামী ৫০ বছরে বিশ্বের ৯৬ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর চরম বিপন্ন হওয়ার চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট

পৃথিবীর বুকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। স্থলভাগের গণ্ডি ছাড়িয়ে তার ভয়াবহ প্রভাব এখন গ্রাস করতে শুরু করেছে সমুদ্রের গভীরে গড়ে ওঠা প্রবালপ্রাচীরগুলিকে। হু হু করে বাড়ছে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা এবং ঘন ঘন আছড়ে পড়ছে ধ্বংসাত্মক সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ। আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন (IUCN)-এর সাম্প্রতিক এক মেগা মূল্যায়নে উঠে এসেছে এক চরম আশঙ্কাজনক তথ্য— ভবিষ্যতের উষ্ণায়ন ও সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের সম্ভাব্য প্রভাব বিচার করলে বিশ্বের প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্রের প্রায় ৯৬ শতাংশই ‘চরম বিপন্ন’ (Critically Endangered) পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার ১৩টি প্রবালপ্রাচীরই চরম বিপদের মুখে: আর্মেনিয়ার ইয়রেভানে রাষ্ট্রপুঞ্জের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন ‘COP17’-এ প্রকাশিত এই প্রথম বিশ্বব্যাপী প্রবালপ্রাচীর মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং চাগোস দ্বীপপুঞ্জ জুড়ে বিস্তৃত ১৩টি প্রবালপ্রাচীর অঞ্চলের মোট আয়তন প্রায় ৮,২৮২.৬ বর্গকিলোমিটার, যা বিশ্বের মোট প্রবালপ্রাচীর এলাকার প্রায় ৪ শতাংশ। বিগত ৫০ বছরের পর্যবেক্ষণে এই অঞ্চলের প্রবালগুলি কম-বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপন্ন থাকলেও, আগামী ৫০ বছরের জলবায়ু পরিবর্তনের গ্রাফ বলছে— দক্ষিণ এশিয়ার ১৩টি প্রবালপ্রাচীর অঞ্চলই শতভাগ চরম বিপন্নতার মুখে পড়তে চলেছে।

আন্দামান থেকে কচ্ছ—বিপদের মুখে ভারতের চার অঞ্চল: এই আন্তর্জাতিক গবেষণায় ভারতের বৈজ্ঞানিক ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ (ZSI)-কে এই মূল্যায়নের নোডাল সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ZSI-এর চার বিজ্ঞানী— ড. সি. রঘুনাথন, ড. তমাল মণ্ডল, ড. জে. এস. যোগেশ কুমার এবং ড. চন্দ্রন রেথিনারাজ এই আঞ্চলিক মূল্যায়নের সহ-লেখক হিসেবে কাজ করেছেন। গবেষণায় ভারতের চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবালপ্রাচীর অঞ্চলকে চরম বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে:

  • আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রবালপ্রাচীর।

  • লাক্ষাদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জের প্রবালপ্রাচীর।

  • মান্নার উপসাগর ও পক প্রণালীর প্রবালপ্রাচীর।

  • কচ্ছ উপসাগরের প্রবালপ্রাচীর।

দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মোট ৩৫০টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে ১৬২টি বা প্রায় ৪৬.৩ শতাংশ তথ্যই সরবরাহ করেছে ভারতের বিজ্ঞানীরা।

মাস কোরাল ব্লিচিং ও অস্তিত্বের সংকট: গবেষণায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, সমুদ্রের জল দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ থাকলে প্রবালের শরীরে থাকা সহায়ক শৈবাল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে প্রবাল তার স্বাভাবিক বর্ণ হারিয়ে সম্পূর্ণ সাদা হয়ে যায়— যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘মাস কোরাল ব্লিচিং’ বলা হয়। খাদ্যাভাবে একসময় মৃত্যু ঘটে প্রবালের। ১৯৯৮ এবং ২০১৬ সালের প্রবাল বিবর্ণতার ঘটনা তার মর্মান্তিক প্রমাণ।

উষ্ণায়নের পাশাপাশি উপকূলবর্তী নির্মাণকাজ, সমুদ্রের তলদেশে ড্রেজিং, পলি জমা, মাত্রাতিরিক্ত দূষণ এবং অবাধে মাছ শিকার প্রবালের বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ZSI-এর বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. তমাল মণ্ডল সতর্ক করে বলেছেন, “পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো প্রবালপ্রাচীর দেখার সুযোগই পাবে না। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রবালপ্রাচীরের ভূমিকা অপরিসীম।”

আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের জোর দাবি: বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের লাগাম টানা না গেলে সমুদ্রের এই বর্ণময় ও মূল্যবান জগৎ চিরতরে হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়। কোনো একটি দেশের পক্ষে একা এই বিপর্যয় রোধ করা অসম্ভব; তাই প্রবালপ্রাচীর রক্ষায় সমস্ত দেশকে অবিলম্বে যৌথ ও কঠোর পদক্ষেপে নামতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *