পুরুষতান্ত্রিক দেওয়াল ভেঙে কুমোরটুলিতে বিপ্লব! শিলিগুড়ির তরুণীদের সুনিপুণ তুলির টানে তাক লাগা শহর

একসময় ‘কুমোরটুলি’ বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠত পুরুষ কারিগরদের ক্লান্তিহীন ব্যস্ততার ছবি। কেউ মাটির প্রতিমায় শেষ মুহূর্তের ফিনিশিং দিচ্ছেন, কেউ মায়ের গায়ে সুনিপুণ রঙে রূপ ফুটিয়ে তুলছেন, আবার কেউ বা নিপুণ হাতে আঁকছেন দেবীর চোখ। কোথাও বা চলত প্রতিমার সাজসজ্জার প্রস্তুতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে সেই পুরোনো চেনা ছবি। শিলিগুড়ির কুমোরটুলিতে এবার দেখা মিলল এক অন্যরকম বিপ্লবের। প্রতিমা তৈরির পুরুষতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসছেন নতুন প্রজন্মের তরুণীরাও।

বিশেষ করে প্রতিমার রং করা, দেবীর চোখ আঁকা এবং কলকার মতো অত্যন্ত সূক্ষ্ম শিল্পকর্মে নিজেদের দক্ষতার অনন্য পরিচয় দিচ্ছেন ২২ থেকে ২৪ বছর বয়সি একঝাঁক যুবতী। সদ্য কলেজের গণ্ডি পেরোনো প্রায় ছ’-সাত জন তরুণীর এই সাহসী উদ্যোগ বর্তমানে গোটা শিল্পজগতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

পরিবারের ঐতিহ্য নয়, ভালোবাসা ও জেদই হাতিয়ার:
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই তরুণীদের অনেকের পরিবারেই প্রতিমা তৈরির পেশাগত কোনো পূর্ব ইতিহাস বা ঐতিহ্য ছিল না। কেউ বাবার কাছ থেকে কিছুটা কাজ শিখেছেন, আবার কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন টিউটোরিয়াল দেখে নিজেই রপ্ত করেছেন প্রতিমা গড়ার ও সাজানোর নানা কলাকৌশল।

শুধুমাত্র পেটের টানে বা পেশার তাগিদে নয়, শিল্পের প্রতি সুগভীর ভালোবাসা এবং নিজেদের সৃজনশীলতাকে বাঁচিয়ে রাখার তীব্র তাগিদ থেকেই তাঁরা ভিড় জমাচ্ছেন কুমোরটুলিতে। দুর্গাপুজোর তুমুল ব্যস্ততা কাটতে না কাটতেই এবার কালীপুজোর প্রতিমা তৈরির কাজেও দিনরাত এক করে হাত লাগিয়েছেন তাঁরা। Gen Z প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা শিল্প-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় উদাসীন— এমন প্রচলিত ধারণাকেও যেন সশব্দে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন এই আত্মবিশ্বাসী যুবতীরা।

সুস্মিতার সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প:
শিলিগুড়ির শরৎচন্দ্র পল্লির বাসিন্দা তরুণী সুস্মিতা পাল গত দু’বছর ধরে নিয়মিত শিলিগুড়ির কুমোরটুলিতে এসে প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত রয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই এই শিল্পের প্রতি তাঁর অন্তহীন টান। যদিও তাঁর বাবা পেশাগতভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত নন, তবুও বাবার হাত ধরেই তাঁর কাজের হাতেখড়ি হয়েছিল। প্রতিমার নিখুঁত কলকার কাজেই মূলত সুস্মিতার হাত সবচেয়ে পোক্ত।

চলতি বছর দুর্গাপুজোর প্রতিমার কাজের পাশাপাশি কালীপুজোর প্রস্তুতিতেও সমানতালে ব্যস্ত তিনি। বর্তমানে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত একটানা চলে তাঁর কাজ। সদ্য গ্র্যাজুয়েশন শেষ করা সুস্মিতা ভবিষ্যতে এই শিল্পকেই নিজের জীবনের মূল পথ হিসেবে বেছে নিতে চান। তাঁর কথায়, “গত বছর নিজের বয়সি মেয়েদের মধ্যে আমি প্রায় একাই ছিলাম। কিন্তু এবারে আরও চার-পাঁচ জন তরুণীকে এই কাজে যুক্ত হতে দেখে আমার বুক গর্বে ভরে গেছে। নতুন প্রজন্মের মেয়েরা এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

ডিজিটাল দুনিয়া থেকে শিল্পীর জার্নি:
অন্যদিকে, হায়দারপাড়ার বাসিন্দা অন্য এক তরুণী সুস্মিতাও চার-পাঁচ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। পড়াশোনা সামলানোর পাশাপাশি এতদিন কাজ চালিয়ে গেলেও গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার পর তিনি এখন পুরোপুরি মনোনিবেশ করেছেন শিল্পের দুনিয়ায়। তবে তাঁর শেখার পথটা ছিল কিছুটা আলাদা ও আধুনিক। কোনো পেশাদার প্রশিক্ষকের কাছে না গিয়ে তিনি মূলত সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউব দেখে দেখে ধীরে ধীরে রপ্ত করেছেন প্রতিমা তৈরির নানা খুঁটিনাটি। তাঁর মতে, শুধুমাত্র কাজ জানলেই হয় না, এই শিল্পের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থাকা বাধ্যতামূলক। মনের টান না থাকলে এই ধৈর্যশীল কাজ দীর্ঘকাল চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

শিল্পের কোনো লিঙ্গ হয় না:
ব্যস্ত পুজোর মরশুমে খাওয়া-দাওয়ার কথা ভুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মায়ের রূপ ফুটিয়ে তোলার কাজে মগ্ন থাকছেন এই তরুণীরা। পারিবারিক ব্যবসার চেনা গণ্ডি পেরিয়ে, নিজেদের ইচ্ছাশক্তি এবং শেখার স্পৃহাকে সম্বল করেই তাঁরা আজ প্রতিমা শিল্পের উজ্জ্বল মুখ হয়ে উঠছেন। পুরুষশাসিত এই শিল্পক্ষেত্রে নিজেদের শক্ত জায়গা তৈরি করে নেওয়ার পাশাপাশি তাঁরা আগামী প্রজন্মের কাছেও এক স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন— শিল্পের কোনো লিঙ্গ হয় না, ভালোবাসা আর নিষ্ঠা থাকলে যে কেউ নিজের হাতে গড়ে তুলতে পারে সৃষ্টির এক অনন্য রূপ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *