“শুধু বাজি বন্ধ করলেই দূষণ কমে না!” দীপাবলির আগেই সুপ্রিম কোর্টের অভূতপূর্ব পর্যবেক্ষণ, মিলল ছাড়পত্র

পরিবেশ দূষণ রোধে আতশবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করাই কি একমাত্র সমাধান? দীপাবলি উৎসবের মুখে দাঁড়িয়ে এই নিয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ পেশ করল দেশের শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের মতে, বাজি পোড়ানো পুরোপুরি বন্ধ করলেই যে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে— এমন দাবির পক্ষে কোনো পর্যাপ্ত বা সঠিক তথ্যপ্রমাণ নেই।
বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি বরালের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই মামলার শুনানিতে স্পষ্ট জানান, ২০২৪ সালে দিল্লি-এনসিআর এলাকায় সম্পূর্ণ বাজি নিষিদ্ধ করা হলেও বায়ুর গুণমান সূচক বা AQI-তে কিন্তু কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
স্কন্দপুরাণ থেকে বারুদের যুগ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা:
মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র ও চিন্তাবিদরা পরিবেশকে ধর্মের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করতেন। আদালত উল্লেখ করে, ‘স্কন্দপুরাণ’ এবং ‘পদ্মপুরাণ’-এর মতো সুপ্রাচীন গ্রন্থে দীপাবলিতে কেবল প্রদীপ জ্বালানোর উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু কয়েক শতাব্দী আগে ভারতে বারুদ আসার পরই উৎসব পালনে বদল ঘটে এবং আতশবাজির প্রচলন শুরু হয়।
সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সুস্থ ও দূষণমুক্ত পরিবেশে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আদালত স্পষ্ট জানায়, অনুচ্ছেদ ২৫ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার থাকলেও তা জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ঊর্ধ্বে নয়। তবে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে সুষম পথ খোঁজার ওপরই জোর দিয়েছে আদালত।
৭ ও ৮ নভেম্বর মিলল বাজি পোড়ানোর অনুমতি:
সমস্ত দিক বিবেচনা করে শীর্ষ আদালত আপাতত ঢালাও নিষেধাজ্ঞার বদলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পরিবেশবান্ধব বাজি বা ‘গ্রিন ক্র্যাকার’ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী:
তারিখ: আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর (২০২৬) দীপাবলি উপলক্ষে বাজি ফোটানো যাবে।
নির্দিষ্ট সময়সূচি: সকালে ৬টা থেকে ৭টা এবং রাতে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বাজি পোড়ানো যাবে।
শর্তাবলী: শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার অনুমোদিত এবং CSIR-NEERI ও PESO-র বৈধ শসংস্থাপত্র প্রাপ্ত গ্রিন ক্র্যাকারই বিক্রি ও ব্যবহার করা যাবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাজি বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
‘নো-ক্র্যাকার জোন’ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা:
আদালত কড়া নির্দেশ দিয়ে জানিয়েছে, হাসপাতাল, নার্সিংহোম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো স্পর্শকাতর এলাকার অন্তত ৩০০ মিটারের মধ্যে বাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই এলাকাগুলিকে স্পষ্ট ‘নো-ক্র্যাকার জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি বেঞ্চ মনে করিয়ে দেয়, বাজি পোড়ানোর সূক্ষ্ম ধূলিকণা দীর্ঘ সময় বাতাসে ভেসে থেকে মানবদেহের রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে, যা শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের মারাত্মক ক্ষতি করে। দিল্লি-এনসিআরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং শীতকালের কম বাতাসের গতিও এই দূষণ আটকে রাখার অন্যতম কারণ।
১৬ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানি:
আদালতের নির্দেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ৯ নভেম্বর থেকে ফের সারা বছর বাজি পোড়ানোর ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয়ে যাবে। এছাড়া দীপাবলির পরে বায়ুদূষণ এবং হাসপাতালে রোগী ভর্তির পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলিকে আদালতে রিপোর্ট পেশ করতে হবে। এই জনস্বার্থ মামলার পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত হয়েছে আগামী ১৬ ডিসেম্বর।