‘আমাদের হাতে আর সময় নেই!’ মাঝপাহাড়ে বিকট শব্দ, ফ্লোরিডায় ৩৫ হাজার ফুট থেকে আছড়ে পড়ল বিমান

“আমাদের হাতে আর সময় নেই!”—ফ্লোরিডার ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার (Florida Plane Crash) ঠিক আগের মুহূর্তে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের রেডিয়ো বার্তায় ভেসে এসেছিল এক ক্রু সদস্যের এই গগনভেদী আর্তনাদ। বিপদবার্তা পাঠিয়েও শেষরক্ষা হলো না। পাইলটের একের পর এক আতঙ্কজনক বার্তা এবং তার ঠিক পরেই কান ফাটানো বিকট শব্দ—এক নিমিষে শেষ হয়ে গেল সব। প্রায় ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ফ্লোরিডার ব্যস্ত রাস্তায় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে একটি বিমান। ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৯ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আমেরিকার ফ্লোরিডার পাম বিচ কাউন্টির গ্রিনএকরসের একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

ঠিক কীভাবে ঘটেছিল এই দুর্ঘটনা?
তথ্য অনুযায়ী, লিয়ারজেট ৬০ (Learjet 60) বিমানটি টেক্সাসের অস্টিন-বার্গস্ট্রম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাহামার নর্থ এলিউথেরার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। আকাশপথে প্রায় ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে পূর্ব দিকে এগিয়ে চলার সময় বিমানটিতে প্রবল ঝাঁকুনি শুরু হয়। আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ায় সেটি বরফ ও তীব্র বৃষ্টিপাতের মুখে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পাইলট আরও দুই হাজার ফুট উঁচুতে ওঠার অনুমতি চান। এর আগে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে (ATC) তিনি জানিয়েছিলেন, হালকা বরফ জমলেও তা সামলানো সম্ভব, যদিও মাঝারি ধরনের ঝাঁকুনি হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির কবলে পড়ার পরেই পরিস্থিতি চোখের পলকে হাতের বাইরে চলে যেতে শুরু করে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা এবং এটিসি-র রেকর্ড বলছে, শুরুতে বিমানটি প্রায় ৪১ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠেছিল। এরপরই শুরু হয় তার ভয়াবহ পতন। প্রথমে প্রতি মিনিটে প্রায় ১০ হাজার ফুট, পরে তা বেড়ে ২০ হাজার ফুট এবং শেষ পর্যায়ে প্রতি মিনিটে ৩২ হাজার ফুটেরও বেশি গতিতে উচ্চতা হারাতে শুরু করে বিমানটি। দ্রুত নীচে নামার সময় হঠাৎই ডান দিকে এক তীব্র ও বিপজ্জনক বাঁক নেয় সেটি। রাডারে বিমানটির শেষ সংকেত ধরা পড়েছিল প্রায় ৮ হাজার ৭৫০ ফুট উচ্চতায়।

মৃত্যুর আগের মুহূর্তের সেই হাড়হিম করা রেডিয়ো বার্তা
বিমান ভেঙে পড়ার আগের শেষ কয়েক মিনিটের এটিসি কথোপকথনে ধরা পড়েছে চরম বিপর্যয়ের সেই মুহূর্তগুলি। বিমানের অন্দরে বাড়ছিল ভয়াবহ ঝাঁকুনি এবং জমছিল বরফ। দ্রুত উচ্চতা কমতে থাকায় বারবার মে-ডে (Mayday) কল পাঠাতে শুরু করেন পাইলট ও ক্রু সদস্যরা।

পাইলটকে বলতে শোনা যায়, “আমরা ৮ হাজার ফুট নীচে নামছি। মে-ডে, মে-ডে! প্রতি মিনিটে ১০ হাজার ফুট করে নীচে নামছি।”

এর মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পাইলট চিৎকার করে জানান, “আমরা ওভারস্পিড পরিস্থিতিতে রয়েছি। প্রতি মিনিটে ২০ হাজার ফুট করে নীচে নামছি।” এর ঠিক পরেই ভেসে আসে সেই শেষ বার্তা— “আমরা মাটিতে আছড়ে পড়তে চলেছি।” বিমানের অপর প্রান্তে থাকা এক মহিলা ক্রু সদস্য আতঙ্কে চিৎকার করে বলে ওঠেন, “আমাদের হাতে আর সময় নেই।” এটিসি আধিকারিকরা পরিস্থিতি সামাল দিতে যোগাযোগের চেষ্টা চালালেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

সামনে এল দুর্ঘটনার শিহরণ জাগানো ভিডিয়ো
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে দুর্ঘটনার ভয়াবহ কিছু দৃশ্য। একটি ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, দিনের বেলায় একটি স্বাভাবিক রাস্তায় হঠাৎই আকাশ থেকে বিদ্যুৎ গতিতে নেমে আসছে একটি বিশালাকার বিমান। চোখের পলকে তা মাটিতে আছড়ে পড়ে এবং বিস্ফোরণে ঢেকে যায় চারপাশ। অন্য একটি ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, ইমপ্যাক্টের জেরে রাস্তায় বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিমানের টুকরো ও কংক্রিট। আকাশে উঠছে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা ত্রস্ত হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন।

দুর্ঘটনাস্থলের আশেপাশেই বহু মানুষের বসবাস ছিল। অল্পের জন্য আরও বড় বিপর্যয় এড়ানো গিয়েছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী মহিলার ঘরের সামনেই যখন এই বিস্ফোরণ ঘটে, তখন তিনি ও তাঁর সন্তান ঘর থেকে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে তাঁদের গোটা অ্যাপার্টমেন্ট।

উল্লেখ্য, এই দুর্ঘটনাস্থলটি মার-আ-লাগো (Mar-a-Lago) থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ মাইল পশ্চিমে এবং ওয়েস্ট পাম বিচের একটি বিমানবন্দর থেকে ৪ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুর্ঘটনার ঠিক এক ঘণ্টারও কম সময় আগে ঠিক ওই বিমানবন্দর থেকেই রওনা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ঠিক কী কারণে আচমকা এই মারাত্মক পতন ঘটল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *