‘চরম শুদ্ধি অভিযান নাকি ক্ষমতার লোভ!’ চতুর্থ মেয়াদের ঠিক আগে ৩৩ শীর্ষ কর্মকর্তাকে এক ধাক্কায় বরখাস্ত করে কাঁপন ধরালেন শি জিনপিং!

চিনের রাজনীতি এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার অলিন্দে আবারও এক তীব্র ও নজিরবিহীন আলোড়ন তৈরি করলেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অভিযানের কথা বলে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে একেবারে এক ধাক্কায় বহিষ্কার করা হয়েছে ৩৩ জন শীর্ষ স্তরের কর্মকর্তাকে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই ছাঁটাই তালিকায় কেবল রাজনৈতিক আমলারা নন, বরং দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর অত্যন্ত উচ্চপদস্থ জেনারেল ও কমান্ডারসহ মোট ১৬ জন সামরিক কর্মকর্তা রয়েছেন। আগামী ২০২৭ সালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্টি কংগ্রেসকে সামনে রেখে—যেখানে শি জিনপিং রেকর্ড চতুর্থবারের মতো দলের প্রধান হিসেবে নিজের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন—এই মেগা রদবদল বেইজিংয়ের ক্ষমতা কাঠামোর অন্দরে নতুন এক চরম অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।
সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের হেভিওয়েট নেতারাও বাদ! কার হাতে গেল ক্ষমতার চাবিকাঠি?
সম্প্রতি সমাপ্ত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও গুরুতর আইন লঙ্ঘনের দায়েই এই নেতাদের বিরুদ্ধে এই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
-
যাঁদের কুপোকাত করা হয়েছে: বহিষ্কৃত এই হাই-প্রোফাইল তালিকায় যেমন রয়েছেন সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান ঝাং ইউক্সিয়া এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডার লিউ ঝেনলির মতো তাবড় হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বরা, তেমনই রয়েছেন সাবেক শিল্পমন্ত্রী জিন ঝুয়াংলংসহ একাধিক আর্থিক ও কূটনৈতিক খাতের প্রভাবশালী আমলা।
-
ক্ষমতার একক কেন্দ্রীকরণ: চিনের সামরিক বাহিনীর একেবারে শীর্ষস্থানীয় জেনারেলদের একের পর এক ছেঁটে ফেলার ফলে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের কার্যকরী নেতৃত্ব এখন কার্যত সংকুচিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে এই বিশাল শক্তির রাশ পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত রয়েছে কেবল প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সেনাপ্রধান ঝাং শেংমিনের হাতে। শুধু তাই নয়, ঝাং শেংমিনকে দলীয় সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পলিটব্যুরোর সদস্য পদেও উন্নীত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন: এটি কি শক্তির প্রদর্শন নাকি তীব্র নিরাপত্তাহীনতা?
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শি জিনপিং ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’-এর অস্ত্রকে কাজে লাগিয়ে দল ও সামরিক বাহিনীর ওপর নিজের একক ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ পোক্ত করার নীতি নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক এই ব্যাপক ছাঁটাই যেন সেই নীতিরই আজ পর্যন্ত সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ও নির্মম বহিঃপ্রকাশ।
তবে পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA)-র একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া এই ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মনে বড়সড় ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একদিকে যখন শি জিনপিং সেনার সম্পূর্ণ আনুগত্য ও নিয়ন্ত্রণ নিজের মুঠোয় রাখতে মরিয়া, অন্যদিকে সামরিক নেতৃত্বের বারবার এভাবে ভেঙে পড়া এবং শীর্ষ পদগুলো শূন্য হয়ে যাওয়া চিনের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করছে। নিজের ক্ষমতাকে আরও বেশি সংহত করার এই আগ্রাসী পদক্ষেপে চিনের কমিউনিস্ট পার্টির অন্দরে কতটা ভীতি, আতঙ্ক ও ক্ষোভের আবহ তৈরি হলো, সেটাই এখন বিশ্ব কূটনীতির আলোচনার সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে!