“৩০ হাজার টাকা বেতন চাই!” উত্তাল পরিস্থিতি, পুলিশ বক্সে আগুন, ফের বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রণক্ষেত্রের রূপ নিল ওপার বাংলা। তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের ক্ষোভ ও আন্দোলনের জেরে চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের একাধিক শিল্পাঞ্চল। বেতন না বাড়ার অভিযোগ তুলে রবিবার সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা এবং গাজিপুরের রাজপথে নেমে তাণ্ডব ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন হাজার হাজার শ্রমিক।
রাজপথ অবরোধ ও পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ
ঘটনার সূত্রপাত রবিবার সকালে। গাজিপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর বাজার, চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক এবং তেলিচালা সহ ঢাকা-টাঙ্গাইল জাতীয় সড়কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে হাতে লাঠি ও ব্যানার নিয়ে জমায়েত হন পোশাক শ্রমিকরা। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে চলা এই বিক্ষোভ চলাকালীন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
কোনাবাড়ি এলাকায় জাতীয় সড়কের ওপর অবস্থিত একটি পুলিশ বক্সে আগুন লাগিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা। কোনাবাড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক ইফতেখার হুসেন অগ্নিকাণ্ডের খবর নিশ্চিত করেছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী অর্থাৎ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)-এর পাঁচ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
একইভাবে রাজধানী ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর চৌরাস্তায় শত শত শ্রমিক রাস্তা আটকে বিক্ষোভ শুরু করলে চরম দুর্ভোগ দেখা দেয়। সুরক্ষাস্বার্থে মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চরম আঘাতের আশঙ্কা
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত অপরিসীম।
-
কর্মসংস্থান: দেশের প্রায় ৪ হাজার নথিভুক্ত কারখানায় কাজ করেন ৪০ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক।
-
বিশ্ববাজারে স্থান: চিনের পরই বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ।
-
রফতানি আয়: ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষেই বাংলাদেশ থেকে বিশ্বজুড়ে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে।
বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে পোশাক সরবরাহকারী এই বিশাল শিল্পে টানা অসন্তোষ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি বড় সড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিস্থিতি সামলাতে নড়েচড়ে বসল সরকার, গঠিত ‘মজুরি বোর্ড’
আন্দোলন সামাল দিতে এবং শ্রমিকদের অবিলম্বে কাজে ফেরার আকুল আবেদন জানিয়েছেন বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরি। জাতীয় সচিবালয়ে জরুরি সাংবাদিক বৈঠক ডেকে তিনি জানান, সরকার শ্রমিকদের এই দাবিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে।
শ্রমিকদের দাবি পর্যালোচনা করে একটি নতুন ‘ন্যূনতম মজুরি বোর্ড’ গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছেন তিনি।
-
বোর্ডের নেতৃত্ব: সিনিয়র জেলা ও দায়রা বিচারক শেখ আশফাকুর রহমানকে এই মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়েছে।
-
মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধি: বোর্ডে মালিকদের প্রতিনিধি হিসেবে থাকছেন BGMEA-র ডিরেক্টর এ বি এম শামসুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। অন্যদিকে, শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে থাকছেন BGIWF-এর মহাসচিব বাবুল আখতার এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হুসেন।
-
নিরপেক্ষ সদস্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদকে বোর্ডের স্বাধীন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।
সরকারের এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপে আশার আলো দেখছেন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তবে রাজপথ থেকে বিক্ষোভ তুলে নিয়ে ৩০ হাজার টাকার দাবিতে অনড় শ্রমিকরা কাজে ফেরেন কি না, এখন সেটাই দেখার।