তারাপীঠের পাশেই লুকিয়ে থাকা গুপ্তধন! মহাভারতের পাণ্ডবদের ছোঁয়া থাকা এই রহস্যময় মন্দিরের কথা জানেন কি?

লালমাটির জেলা বীরভূম যেন এক অপার রহস্য ও ইতিহাসের ভান্ডার। চেনা পর্যটন কেন্দ্রগুলির ভিড় ছেড়ে যাঁরা একটু অন্যরকম, নিভৃত এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে চান, তাঁদের কাছে আদর্শ এক উইকএন্ড গন্তব্য হতে পারে বীরভূমের প্রাচীন জনপদ কোটাসুর। তারাপীঠ থেকে খুব বেশি দূরে নয়, রামপুরহাট স্টেশন থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে ময়ূরেশ্বর থানার অন্তর্গত এই জনপদ একসময় ইতিহাসের বহু অজানা অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
পৌরাণিক রাজা কোটেশ্বরের রাজধানী ও পাণ্ডবদের স্মৃতি
লোকবিশ্বাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, সুদূর অতীতে এই অঞ্চল ছিল পৌরাণিক রাজা কোটেশ্বরের রাজধানী। আর সেই রাজার নামানুসারেই কালক্রমে এই এলাকার নাম হয় ‘কোটাসুর’। গ্রামের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে কুলদেবতা মদনেশ্বর শিবের ঐতিহাসিক মন্দির। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাভারতের যুগে পঞ্চপাণ্ডব যখন অজ্ঞাতবাসে ছিলেন, তখন স্বয়ং মাতা কুন্তী এই শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে পুজো করেছিলেন। সেকালে এই পুরো জনপদকে সুরক্ষিত রাখতে গড়ে তোলা হয়েছিল এক বিশাল প্রাচীন প্রাচীর, যার দুই প্রান্তে ছিল দুটি প্রধান ফটক— দক্ষিণ দিকে ‘বাবা সন্ন্যাসী’ এবং উত্তর দিকে কোটাসুর বাজার সংলগ্ন তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান দ্বারবাসিনী কালী মন্দির।
তান্ত্রিক সাধনার গোপন ক্ষেত্র ও অলৌকিক ইতিহাস
রাজা কোটেশ্বরের আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মা দ্বারবাসিনীর এই মন্দির। কালক্রমে অবহেলা আর ঝোপঝাড়ে চারপাশ ঢাকা পড়ে গেলেও, স্থানীয় এক নিষ্ঠাবান পুরোহিত দুর্গাপদ পাণ্ডার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জঙ্গল পরিষ্কার করে ফের মায়ের নিত্যপুজোর সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৩৭৭ বঙ্গাব্দে স্থানীয় গ্রামবাসীদের উদ্যোগে বর্তমান মন্দিরটি নির্মিত হয়।
একসময় এই মন্দির ছিল তন্ত্রসাধকদের অন্যতম গোপন ও শক্তিশালী সাধনক্ষেত্র। আজও প্রতি অমাবস্যায় দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা এখানে ভিড় জমান। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মায়ের দরবারে নিষ্ঠাভরে মানত করলে জীবনের বহু সংকট ও শারীরিক ব্যাধি দূর হয়। বিশেষ করে কালীপুজোর মরশুমে এই মন্দিরের আসল রূপ ও আধ্যাত্মিক আমেজ পর্যটকদের মন জয় করে নেয়।
তারাপীঠের জনপ্রিয়তার আড়ালে ব্রাত্য এই ঐতিহাসিক জনপদ
তবে এর মাঝেই রয়েছে এলাকাবাসীর গভীর আক্ষেপ। কারণ বীরভূম বললেই সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে মহাপীঠ তারাপীঠের নাম। অথচ তারাপীঠের এত কাছে থেকেও এই বিপুল জনপ্রিয়তার আলোয় সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে কোটাসুরের এই প্রাচীন ঐতিহ্য ও দ্বারবাসিনী মন্দির চত্বর। পর্যটকদের মানচিত্রে আজও এই স্থান অনেকাংশে ব্রাত্য। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, রাজ্য সরকার বা পর্যটন দফতর একটু নজর দিলেই তারাপীঠের পাশাপাশি এই ঐতিহাসিক কোটাসুর ও দ্বারবাসিনী কালী মন্দিরও একটি পূর্ণাঙ্গ ও জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। রাঢ় বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতি, তন্ত্রসাধনার ইতিহাস এবং প্রাকৃতিক নিস্তব্ধতাকে একসঙ্গে উপভোগ করার এমন সুযোগ ইতিহাসপ্রেমী ও পুণ্যার্থীদের হাতছাড়া করা উচিত নয়।