স্বাধীনতার আগেই বদলেছিল দিন! ১৯৪৫ সালে দলিত ও আদিবাসীদের জন্য কোন রাজপরিবার নিয়েছিল ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত?

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার এবং সংবিধান কার্যকর হওয়ার বহু আগেই দেশের বেশ কিছু দেশীয় রাজ্যে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও বঞ্চিত মানুষদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ করা হয়েছিল। বৈষম্য দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠার সেই লড়াইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া রাজপরিবার।
দলিত সমাজকে সামাজিক অবহেলা থেকে মুক্তি দেওয়া, মন্দিরে অবাধ প্রবেশের অধিকার, সমান শিক্ষা লাভ এবং সরকারি জলাশয় ব্যবহারের স্বাধীনতা—এমন একাধিক ক্ষেত্রে সাহসিকতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছিল এই রাজপরিবার। শুধু অধিকার দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি প্রশাসন, দলিতদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করা হলে কঠোর শাস্তির বিধানও জারি করা হয়েছিল।
মন্দিরে পুজো থেকে ঘোড়ায় চড়া: ১৯৪৫ সালের ঐতিহাসিক ঘোষণা
সিন্ধিয়া রিসার্চ সেন্টারের নথি অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ৪ মে গোয়ালিয়রের তৎকালীন মহারাজা জীবাজিরাও মাধবরাও সিন্ধিয়া এক ঐতিহাসিক ফরমান জারি করেন। সে সময় সমাজে যাঁদের অস্পৃশ্য বা হরিজন হিসেবে গণ্য করা হতো, তাঁদের দেশের অন্য সাধারণ নাগরিকদের মতো সমান মৌলিক অধিকার প্রদান করা হয়।
তৎকালীন ভারতবর্ষে দলিতদের ক্ষেত্রে মন্দিরে প্রবেশ, সরকারি কুয়ো থেকে জল নেওয়া, স্কুলে পড়াশোনা কিংবা বিয়ের শোভাযাত্রায় ঘোড়া ও পালকিতে চড়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সিন্ধিয়া রাজপরিবারের এই ঘোষণার পর দলিত সম্প্রদায় নিজেদের পছন্দমতো পোশাক-অলংকার পরা, যানবাহন ব্যবহার এবং বিয়ের সামাজিক রীতিনীতি পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা পায়। সেই সঙ্গে রাজ্যের মালিকানাধীন বা পরিচালিত মন্দিরে প্রবেশ করে সাধারণ পুণ্যার্থীদের মতোই পুজো দেওয়ার অধিকার সুনিশ্চিত হয়। আর এই অধিকারে কেউ বাধা দিলে তার বিরুদ্ধে রাজ্যের আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদিবাসী শিশুদের শিক্ষা ও জীবনজীবিকার বড় উদ্যোগ
শুধু দলিতদের সামাজিক অধিকার রক্ষা নয়, আদিবাসী সমাজের সার্বিক শিক্ষার প্রসারেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল সিন্ধিয়া রাজপরিবার। ১৯৩৮ সালের মধ্যেই গোয়ালিয়র রাজ্যে ভিল ও ভিলালা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য ১১টি বিশেষ স্কুল এবং ৩টি বিনামূল্যে থাকার হোস্টেল চালু করা হয়। শেওপুর এলাকায় সাহারিয়া সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্যও অনুরূপ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
পড়াশোনার পাশাপাশি আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে কারিগরি ও হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। টান্ডা ও বাগ এলাকায় নির্মিত হোস্টেলের পাশাপাশি বাগ এলাকার পাণ্ডব গুহা পাহাড়ে বন দপ্তরের তত্ত্বাবধানে একটি ‘মডেল স্কুল’ চালু করা হয়। এর সঙ্গে ছিল মেধাবী পড়ুয়াদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা এবং গ্রামে গ্রামে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গড়ে তুলে আদিবাসী সম্মেলনের মাধ্যমে মানুষের সমস্যা শোনার উদ্যোগ।
পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য বিশেষ কমিশন
সমাজের পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের প্রকৃত অবস্থান ও চাহিদা খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ কমিশন গঠন করেছিল গোয়ালিয়র প্রশাসন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও সমাজ সংস্কারকদের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব আহ্বান করে তা স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মাধ্যমে সরাসরি পর্যালোচনা করা হতো, যাতে প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
আম্বেদকরের উচ্চশিক্ষা ও অন্যান্য রাজপরিবারের ভূমিকা
সিন্ধিয়া রাজপরিবারের পাশাপাশি বদোদরার মহারাজা সয়াজিরাও গায়কোয়াড় এবং কোলহাপুরের ভোঁসলে রাজপরিবারও সমাজ সংস্কারে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিল। মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলে এবং ডঃ ভীমরাও আম্বেদকরের শিক্ষার প্রসারে বদোদরার মহারাজার অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ডঃ আম্বেদকরকে উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সহায়তা ও স্কলারশিপ প্রদান করেন মহারাজা সয়াজিরাও গায়কোয়াড়, যার সুবাদেই আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান স্বাধীন ভারতের সংবিধানের প্রণেতা।
ভারতের সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর সাম্য, স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, তার বহু আগেই দেশের প্রগতিশীল রাজপরিবারগুলির হাত ধরে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সেই লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল।