মালদা-মুর্শিদাবাদকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে পারে গঙ্গা! ভাঙন রুখতে নদীর গতিপথ বদলের মেগা পরিকল্পনা

গঙ্গার গ্রাসে তলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক গ্রাম! মালদা-মুর্শিদাবাদকে স্থায়ী সুরক্ষা দিতে নদীর গতিপথ বদলের মেগা পরিকল্পনা

বর্ষা বিদায় নিয়েই নদী শান্ত হলেও, মালদা এবং মুর্শিদাবাদের নদীপাড়ের মানুষের বুক থেকে এখনও কাটেনি ভাঙনের আতঙ্ক। কোথাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বসতভিটে, কোথাও আবার মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে গিয়েছে আস্ত গ্রাম। এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে দুই জেলাকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে এবার কোমর বেঁধে আসরে নেমেছে রাজ্য সরকার। গঙ্গাকে তার পুরনো খাতে ফিরিয়ে আনা, নদীর বুক থেকে পলি ও চর সরাতে ড্রেজিং এবং স্পার (Spur) নির্মাণের মতো একগুচ্ছ মেগা পরিকল্পনা ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন সর্বস্বহারা বাসিন্দারা।

দিল্লির দরবারে বৈঠক, এক বছরের মধ্যে মিলবে সুফল?

এর আগে গঙ্গার ভাঙন রোধে মালদার মানুষকে আর রাত জাগতে হবে না বলে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে সম্প্রতি দিল্লিতে কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রী সি আর পাতিলের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে বৈঠক করেছেন তিনি। ওই বৈঠকে বিহার ও ঝাড়খণ্ডের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ্রের সঙ্গে যৌথ এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো—আগামী এক বছরের মধ্যে মালদা ও মুর্শিদাবাদের মানুষকে ভাঙনের হাত থেকে চিরতরে মুক্ত করা।

প্রশাসনিক তথ্য বলছে, ২০০৪ সাল পর্যন্ত গঙ্গার ভাঙনে কেবল মালদারই প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। মানচিত্র থেকে মুছে গিয়েছে অন্তত ৬৭টি মৌজা। রতুয়া-১, মানিকচক, কালিয়াচক-২ ও ৩ এবং ইংরেজবাজার ব্লক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। নদীর গ্রাসে মানচিত্র বদলালেও এর মধ্যে নদীবক্ষে নতুন করে জেগে উঠেছে ২৯টি মৌজা চর। যার বেশিরভাগই ঝাড়খণ্ডের কাছাকাছি হওয়ায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

৪৫ কিলোমিটার জুড়ে ড্রেজিং ও স্পার নির্মাণের মাস্টারপ্ল্যান

দিল্লির বৈঠকে ঠিক হয়েছে যে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন রোধে কাজ করা হবে।

  • ড্রেজিং ও গতিপথ বদল: প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং করে নদীর গতিপথে বাধা সৃষ্টি করা চর ও পলি সরিয়ে গঙ্গাকে তার পুরনো স্রোতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

  • স্পার নির্মাণ: নদীর স্রোত যাতে সরাসরি ভাঙনপ্রবণ পাড়ে আছড়ে না পড়ে, তার জন্য স্পার বা স্রোত নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা হবে।

তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সবচেয়ে বড় বাধা হলো তিন রাজ্যের সমন্বয়। রাজ্য সরকারের অভিযোগ, এই প্রকল্পে ঝাড়খণ্ডের কাছ থেকে এখনও পর্যাপ্ত সহযোগিতা মিলছে না। নদী যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আবদ্ধ নয়, তাই বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের যৌথ সদিচ্ছা ছাড়া স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

“পাঁচ বছর পর কংক্রিটের বাঁধ টিকবে তো?” প্রশ্ন স্থানীয়দের

সরকারের এই মেগা উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও নদীপাড়ের বাসিন্দারা চান স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান। রতুয়ার জিতুটোলার বাসিন্দা নারায়ণ তিওয়ারি ও সুভাষচন্দ্র মণ্ডলের মতে, শুধু কংক্রিটের পাড় বাঁধিয়ে লাভ নেই। কারণ গঙ্গা ও ফুলহরের দূরত্ব এখন মাত্র ৭৫০ মিটারে নেমে এসেছে। দুই নদী মিলে গেলে গোটা জেলার অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। তাই চরগুলি কেটে গঙ্গাকে তার পুরনো খাতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই একমাত্র স্থায়ী সমাধান।

আগામী বর্ষা নামার আগেই যদি এই প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু না হয়, তবে নদীপাড়ের হাজার হাজার মানুষের কপালে ফের জুড়বে না স্বস্তির নিঃশ্বাস। এখন দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের অপেক্ষায় দিন গুনছেন সর্বস্বহারা মানুষগুলি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *