বিজেপি কি ফের ১৯৭৭-এর পুনরাবৃত্তির মুখে? রামলীলা ময়দানে বিরোধী সমাবেশের আগে তুঙ্গে চর্চা!

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু হয় না। হার-জিত, অপমান আর প্রত্যাবর্তনের চক্রেই আবর্তিত হয় রাজনৈতিক ভাগ্য। আগামীকাল ৩১ অক্টোবর, ভারতের একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ৪২তম প্রয়াণ দিবস। এমন এক বিশেষ মুহূর্তে, যখন দিল্লিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জাহির করতে রামলীলা ময়দানে মেগা সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আরও একবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ইন্দিরার জীবনের সেই অবিশ্বাস্য এবং ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের গল্প।

বর্ধমানের অতিথিশালায় অসৌজন্যের ছবি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০—এই তিন বছর ছিল ইন্দিরা গান্ধীর জীবনের চরম পরীক্ষার সময়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের একদা পরাক্রমশালী প্রধানমন্ত্রী তখন সাধারণ এক রাজনীতিবিদ। তৎকালীন গোয়েন্দা পুলিশের ডিএসপি (পরবর্তীতে রাজ্য পুলিশের এডিজি) চয়ন মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

বীরভূমে সভা সেরে বর্ধমানের কানাইনাটশাল সেচ দফতরের অতিথিশালাতে উঠেছিলেন ইন্দিরা। সঙ্গে ছিলেন প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়। কোমরের তীব্র যন্ত্রণায় ভুগতে থাকা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর জন্য আরেকটি বাড়তি বালিশ চেয়েছিলেন সুব্রতবাবু। কিন্তু সরকারি রোষানলে পড়ার ভয়ে অতিথিশালার কেয়ারটেকার অতিরিক্ত একটি বালিশ দিতেও অস্বীকার করেন! শেষমেশ জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারের মধ্যস্থতায় সেই বালিশের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। শুধু বর্ধমান নয়, দিল্লির হাসপাতালেও তাঁকে দেখতে যাওয়া ডাক্তার-নার্সরা তৎকালীন জনতা পার্টির সরকারের ভয়ে মুখ লুকিয়ে থাকতেন।

বেলচির কাদা-জল ও হাতির পিঠে চেপে কামব্যাক তবে অপমান বা জেল-জুলুম—কোনোটাই ইন্দিরা গান্ধীকে দমাতে পারেনি। দিল্লির বাংলো হারানো, ট্যাক্সি ডেকে যাতায়াত করা থেকে শুরু করে একাকীত্ব—সবকিছু সামলে তিনি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে বিহারের বেলচিতে যখন ১১ জন দলিতকে হত্যা করা হয়, তখন বর্ষার কাদা-জল উপেক্ষা করে প্রথমে অ্যাম্বাসাডর, তারপর জিপ, ট্রাক্টর এবং শেষমেশ হাতির পিঠে চেপে সেই দুর্গম গ্রামে পৌঁছে যান ইন্দিরা। বেলচির সেই ঐতিহাসিক সফরই ১৯৮০ সালে তাঁকে ৩৫৩টি আসন নিয়ে ফের দিল্লির তখতে বসিয়েছিল।

দেশ গঠনে ইন্দিরার অবদানের ভিত জরুরি অবস্থা জারির ঐতিহাসিক ভুল বা ‘অপারেশন ব্লু স্টার’-এর খেসারত হিসেবে তাঁকে জীবন দিতে হলেও, দেশ গঠনে তাঁর অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা।

  • পূর্ব পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টি করে উপমহাদেশের মানচিত্র বদলে দেওয়া।

  • মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চোখে চোখ রেখে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা।

  • ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট ‘আর্যভট্ট’ উৎক্ষেপণ ও প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা।

  • ব্যাঙ্ক-বিমা-খনি রাষ্ট্রায়ত্তকরণ, সবুজ বিপ্লব এবং গর্ভপাতকে বৈধতা প্রদান।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কি তবে রামলীলা ময়দানে? ইন্দিরার প্রয়াণ দিবসের ঠিক পরদিনই দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে মেগা সমাবেশের ডাক দিয়েছে কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলি। বফর্স বা জরুরি অবস্থার মতো না হলেও, সাম্প্রতিক এসআইআর (SIR) বিতর্ক, ভোটাধিকার সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং নাগরিকত্ব ইস্যুতে ব্যাকফুটে শাসকদল।

কাকতালীয় হলেও সত্য, যে নেত্রী রাজনৈতিক মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ক্ষমতার শীর্ষে ফিরে এসেছিলেন, তাঁর প্রয়াণ দিবসের আবহেই ফের একবার কেন্দ্রে ক্ষমতার সমীকরণ বদলের সলতে পাকাচ্ছে বিরোধী শিবির। এখন দেখার, ইন্দিরার সেই কামব্যাকের রসায়ন কি ২০২৯-এর আগে কংগ্রেস ও তাদের মিত্রদের নতুন রাজনৈতিক দিশা দেখাতে পারে কিনা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *