ইউনেস্কোর নাম ভাঙিয়ে ৫০ কোটির দুর্গাপুজো পাস দুর্নীতি! গ্রেফতার প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, সোজা চিঠি গেল প্যারিসে

ইউনেস্কোর (UNESCO) ঐতিহ্যবাহী তকমা ব্যবহার করে দুর্গাপুজোর ভিউয়িং পাস বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকার মহাপ্রতারণা! কলকাতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেন চন্দননগরের প্রাক্তন বিধায়ক, গায়ক তথা সাবেক রাজ্য প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। বুধবার ইডি (ED) দপ্তর থেকে বেরিয়ে আসার পথেই সিজিও কমপ্লেক্সের বাইরে থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশের ডিডি স্পেশাল সেল। গ্রেফতারির পর থেকেই বউবাজার থানায় রুজু হওয়া প্রতারণা মামলায় লালবাজারে টানা জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে এই প্রভাবশালী প্রাক্তন মন্ত্রীকে।

ঘটনার তদন্তে নেমে এবার সরাসরি আন্তর্জাতিক মঞ্চ ইউনেস্কোর দরজায় কড়া নেড়েছে লালবাজার। ইন্দ্রনীলের মালিকানাধীন সংস্থার সঙ্গে ইউনেস্কোর আদৌ কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছিল কি না, তা জানতে চেয়ে ইতিমধ্যেই ইউনেস্কো কর্তৃপক্ষকে লালবাজারের তরফে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

ইউনেস্কোর নাম ভাঙিয়ে ৫০-৬০ কোটি টাকা তোলার ছক!
তদন্তকারী সূত্রে খবর, ইউনেস্কোর দ্বারা কলকাতার দুর্গাপুজো ‘হেরিটেজ’ তকমা পাওয়ার পর থেকেই একটি বড় চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। মূলত ‘মাসআর্ট’ (MassArt) নামক একটি কোম্পানির তথ্য ঘেঁটেই শুরু হয় লালবাজারের এই বিশেষ অভিযান। অভিযোগ, ইউনেস্কোর লোগো ও ব্র্যান্ড নেম বেআইনিভাবে ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে কলকাতার নামী মণ্ডপ পরিদর্শনের বিশেষ ভিআইপি পাস বিক্রি করা হয়েছিল। আর এই উপায়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা তোলা হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে।

পুজোর পাস বিক্রির এই মেগা আর্থিক কারচুপির অভিযোগে মূলত চারজনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়—
১. ইন্দ্রনীল সেন
২. মধুছন্দা সেন
৩. ধ্রুবজ্যোতি বসু
৪. শান্তনু মৈত্র

জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তির করা সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই বউবাজার থানায় এই প্রতারণা মামলা রুজু হয়। শুধু দুর্গাপুজোর পাস বিক্রিতেই নয়, পুজো কার্নিভাল এবং কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলাতেও কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সাবেক এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে।

লালবাজারে ম্যারাথন জেরা, আন্তর্জাতিক স্তরে তদন্তের জল
বুধবার গভীর রাতে লালবাজারে নিয়ে আসার পর থেকেই ‘মাসআর্ট’ কোম্পানির শেয়ার হোল্ডিং, অর্থ লেনদেন এবং পাসের টাকা কোথায় কোথায় পাঠানো হয়েছে— তা নিয়ে ইন্দ্রনীল সেনকে দফায় দফায় জেরা করছেন গোয়েন্দারা। লালবাজার সূত্রে খবর, ইউনেস্কোর তরফ থেকে জবাব আসলেই এই দুর্নীতির আন্তর্জাতিক জালের শিকড় উন্মোচিত হবে।

“টাকায় মমতার ভাগ থাকতে পারে!”— শুভেন্দুর বিস্ফোরক আক্রমণ
ইন্দ্রনীল সেনের এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির পর রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে রাজনৈতিক পারদ চড়েছে। ঘটনার পর সোজা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাঠগড়ায় তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু দাবি করেন, “দীর্ঘদিন ধরেই তদন্তকারী সংস্থা ও কলকাতা পুলিশ যৌথভাবে তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করছিল। পর্যাপ্ত প্রমাণ হাতে আসার পরেই আইন মেনে পদক্ষেপ করা হয়েছে।” এরপরেই বিস্ফোরক মন্তব্য করে শুভেন্দু বলেন, “আমি একাধিক জনসভায় আগেই দাবি করেছিলাম যে ইন্দ্রনীল সেনের এই পাস কেলেঙ্কারির পেছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ মদত থাকতে পারে। এই কোটি কোটি টাকার তোলাবাজির ভাগের টাকা কার কার পকেটে গিয়েছে, তা এবার প্রকাশ্যে আসা উচিত।”

তৃণমূল জমানার পতন ও নতুন সরকার গঠনের পর একের পর এক দুর্নীতির নথি প্রকাশ্যে আসায় ইন্দ্রনীল সেনের এই গ্রেফতারি রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *