চাকরি হারিয়েও বছরে আয় দেড় কোটি! এক যুবকের স্ট্রাগলের গল্প শুনলে চোখ কপালে উঠবে!

জীবনে চলার পথে অপ্রত্যাশিত বাধা বা প্রথম চাকরির ছাঁটাই অনেকের কাছেই চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কিছু জেদি মানুষ সেই ধাক্কাকেই জীবনের টার্নিং পয়েন্ট বানিয়ে ঘুরে দাঁড়ান। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম রেড্ডিটে (Reddit) শেয়ার করা এক তরুণের অবিশ্বাস্য কেরিয়ার জার্নি এখন নেটদুনিয়ায় রীতিমতো ঝড় তুলেছে। মাত্র ২.৯ লাখ টাকার বার্ষিক বেতনে কর্মজীবন শুরু করা এক যুবক কীভাবে ধারাবাহিক লড়াই, কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক সিদ্ধান্তের জেরে আজ সুদূর সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে (UAE) প্রায় ১.৫ কোটি টাকার বাম্পার বার্ষিক প্যাকেজে চাকরি পেলেন, সেই অনুপ্রেরণামূলক কাহিনী আজ লাখ লাখ তরুণ পেশাদারকে পথ দেখাচ্ছে।
রেডডিট ব্যবহারকারী ‘u/Aggravating_Dot_8757’ নামের ওই তরুণ তাঁর দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ সংগ্রামের অজানা কাহিনী সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়েছিল স্বনামধন্য সংস্থা এলঅ্যান্ডটি ইনফোটেক (L&T Infotech)-এ ম্যানুয়াল টেস্টিং পদের মাধ্যমে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সংস্থার একটি জরুরি অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় পাশ করতে না পারায় ক্যারিয়ারের শুরুতেই তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। প্রথম চাকরির শুরুতে এমন এক চরম ধাক্কা যে কারো আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল, কিন্তু ওই যুবক ভেঙে না পড়ে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। হাল না ছেড়ে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে তিনি আইবিএম (IBM)-এ নতুন চাকরির সুযোগ পেয়ে যান। এই কঠিন সময়ে তাঁর এক বন্ধুর সঠিক পরামর্শ ও অনুপ্রেরণাই তাঁকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল।
আইবিএম-এ যোগ দেওয়ার পর তাঁর মূল আগ্রহ বিগ ডেটা (Big Data) নিয়ে কাজ করার থাকলেও, পরিস্থিতির চাপে তাঁকে প্রথমে ‘জেডি এডওয়ার্ডস’ প্রযুক্তিতে কাজ করতে হয়। তবে নিজের স্বপ্নের জায়গায় পৌঁছানোর জেদ তাঁর মধ্যে অটুট ছিল। নিজের পছন্দের টেকনোলজিতে কাজ করার ইচ্ছার কথা তিনি বারবার ম্যানেজারকে জানান। অবশেষে ২০২০ সালের মে মাসে তাঁর সেই সুপ্ত ইচ্ছে পূরণ হয় এবং তিনি বিগ ডেটা প্রজেক্টে কাজ করার সুবর্ণ সুযোগ পান। এই নতুন প্রযুক্তি রপ্ত করার জন্য তিনি দিনরাত এক করে কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। তিনি জানান, নিজের দক্ষতাকে বাড়ানোর জন্য তাঁকে বহু দিন প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা কাজ করতে হয়েছে। এর ফলে ২০২২ সালের জানুয়ারি নাগাদ তাঁর বার্ষিক বেতন বেড়ে প্রায় ৩.৭৮ লাখ টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেও তুলনামূলকভাবে আর্থিক বৃদ্ধি কম হওয়ায় তিনি চাকরির বাজারে আরও ভালো সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন।
এরপর তাঁর কেরিয়ারে একের পর এক সাফল্যের মোড় আসতে থাকে। টিসিএস (TCS), কগনিজ্যান্ট (Cognizant), উইপ্রো (Wipro) এবং নাইনলিপস (Nineleaps)-এর মতো একাধিক নামী বহুজাতিক সংস্থা থেকে তাঁর কাছে চাকরির অফার আসতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তিনি বিখ্যাত বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস (Airbus)-এ যোগদান করেন, যেখানে তাঁকে বার্ষিক ২৩ লক্ষ টাকা বেতনের পাশাপাশি ৫ লক্ষ টাকার আকর্ষণীয় জয়েনিং বোনাস দেওয়া হয়। সেখানে তিনি ‘প্যালান্টিয়ার ফাউন্ড্রি’ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান এবং সংস্থার একাধিক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের সফল অংশীদার হন। কিন্তু কর্মজীবনে সামান্য খারাপ পারফরম্যান্স রেটিং পাওয়ার পরেই তিনি থেমে থাকেননি, বরং আরও বড় সাফল্যের লক্ষ্যে ফের নতুন চাকরির সন্ধান শুরু করেন।
নিজের পেশাগত যাত্রার কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও জানান যে, এই পর্যায়ে তিনি প্রায় ১৫টি আলাদা আলাদা চাকরির অফার পান এবং শেষ পর্যন্ত থটওয়ার্কস (Thoughtworks)-এ বার্ষিক ৪৮ লক্ষ টাকার লোভনীয় প্যাকেজে যোগ দেন। তবে সেখানে তাঁর কাজের মেয়াদ মাত্র দুই মাস স্থায়ী হয়। এরপর তিনি আরও একটি দুর্দান্ত অফার পান, যেখানে তাঁর বার্ষিক বেতন বেড়ে সোজা ৬২ লক্ষ টাকায় গিয়ে পৌঁছায় এবং সঙ্গে ৫ লক্ষ টাকার জয়েনিং বোনাসও মেলে। সবচেয়ে বড় কথা, এই নতুন চাকরিতে তিনি সম্পূর্ণ বাড়ি থেকে কাজ করার (Work from Home) সুবিধা পান, যার ফলে পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারের সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো তাঁর পক্ষে অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ওই যুবক জানিয়েছেন যে, সম্প্রতি তাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE) থেকে প্রায় ১.৫ কোটি টাকা বার্ষিক বেতনের একটি বিশাল চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা তিনি সানন্দে গ্রহণ করেছেন। তবে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এই বিশাল অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি তাঁর কাছে কেবল টাকার খেলা নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন, কেরিয়ারের পরিধি আরও বাড়ানো এবং নিত্যনতুন পেশাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার এক দুর্লভ সুযোগ।
নিজের এই দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল যাত্রাকে স্মরণ করে তিনি বলেন যে, আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানোর নেপথ্যে ছিল ভাগ্যের কিছুটা সাহায্য, অদম্য জিদ, দীর্ঘমেয়াদী কঠোর পরিশ্রম, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সঠিক মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ। তাঁর এই জীবনমুখী গল্পটি প্রতিটি তরুণ প্রজন্মকে এটাই শিক্ষা দেয় যে, কর্মজীবনের শুরুতে আসা যেকোনো ব্যর্থতা বা চাকরি যাওয়া কখনই আপনার পুরো ভবিষ্যতের শেষ কথা হতে পারে না। জীবনের প্রতিটি বাঁকে নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখা এবং পরবর্তী সুযোগের জন্য নিজেকে সবসময় প্রস্তুত রাখাই হলো আসল সাফল্যের চাবিকাঠি।