দুর্যোগে মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও চিন্তা বাড়াচ্ছে আর্থিক ক্ষতি! ভারতের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ কী?

গত দুই দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে সংঘটিত প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে ভারত। তবে প্রশাসনের এই সাফল্যের মাঝেই বিশেষজ্ঞদের গলার সুর বলছে, দেশের সামনে এখন সম্পূর্ণ নতুন এবং কঠিন এক চ্যালেঞ্জ এসে হাজির হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ংকর প্রভাবে ঘনঘন ডেকে আনা বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজি, স্থায়ী পরিকাঠামো এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করাটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তীব্র তাপপ্রবাহ, পাহাড়ি ধস এবং দাবানলের মতো ঘটনা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, আপৎকালীন উদ্ধার ও মোকাবিলা ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিপর্যয়জনিত আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির গ্রাফ নিম্নমুখী নয়। তাই শুধুমাত্র জীবন বাঁচানোর গণ্ডি পেরিয়ে এবার দুর্যোগ প্রতিরোধ এবং পরিকাঠামো মজবুত করার পেছনে সরকারি স্তরে আরও অনেক বেশি পরিমাণে বিনিয়োগ করার জোরালো দাবি উঠতে শুরু করেছে। এই ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে ওড়িশার উদাহরণ দেখলে। ১৯৯৯ সালের বিধ্বংসী সুপার সাইক্লোনে ওই রাজ্যে প্রায় ১০ হাজার মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। অথচ ঠিক কুড়ি বছর পর যখন শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ আছড়ে পড়েছিল, তখন রাজ্য প্রশাসন ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে রেকর্ড ১২ লক্ষ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, সেবার মৃত্যুর সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৪। এর থেকেই স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আগে থেকে সঠিক প্রস্তুতি এবং দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিলে ঠিক কতটা প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

তবে ‘ফণী’র মতো ঝড়ঝাপ্টা আমাদের সামনে চিন্তার এক বিরাট ক্ষেত্রও তৈরি করে দিয়ে যায়। ওই একই ঘূর্ণিঝড়ে সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি কাঁচা ও পাকা বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, উপড়ে গিয়েছিল অসংখ্য বিদ্যুতের খুঁটি এবং উপকূলবর্তী অঞ্চলের প্রচুর গাছপালা। যদিও বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু ঘরবাড়ি, সাধারণ মানুষের রুটি-রুজি এবং সরকারি সম্পত্তির সেই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, শুধু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়াই সমস্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। গোটা দেশেই এখন দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকাঠামোকে নতুন রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। চলতি বছরেই যেমন অসমের বিধ্বংসী বন্যায় প্রায় ১০০ জনের প্রাণ গিয়েছে, কেরলে ধস নেমেছে এবং জম্মু ও কাশ্মীরে মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে প্রায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি, ঝাড়খণ্ডে বজ্রপাতে ১৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন খেতমজুর।

এই সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরাট একটা আর্থিক ধাক্কাও দেশীয় অর্থনীতিকে বহন করতে হয়। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD)-র তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভারতের প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৪ শতাংশ ক্ষতি হয়। এই বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতেই এখন দুর্যোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সূত্রে খবর, ষোড়শ অর্থ কমিশন ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রায় ২ লক্ষ ৮৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। পাশাপাশি, তাপপ্রবাহ এবং বজ্রপাতকেও জাতীয় স্তরে বিজ্ঞাপিত দুর্যোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে এই বিশাল অঙ্কের বরাদ্দের ভাগবাঁটোয়ারা পর্যালোচনা করলেই একটি বড় ফারাক চোখে পড়ে। মোট বরাদ্দের প্রায় ১ লক্ষ ৬৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত রয়েছে শুধুমাত্র ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের জন্য। অথচ দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো বা দীর্ঘমেয়াদি প্রশমনের জন্য বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সহজ কথায় বলতে গেলে, দুর্যোগ প্রতিরোধের পেছনে যেখানে মাত্র এক টাকা খরচ করা হচ্ছে, সেখানে উদ্ধারকাজের জন্য খরচ হচ্ছে প্রায় চার টাকা। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, এই অনুপাতটি এবার পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ দুর্যোগ ঘটার অনেক আগেই যদি আমরা প্রতিরোধের প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করি, তবে পরবর্তীকালে পুনর্গঠন ও মেরামতের বিপুল খরচ অনেকটাই বাঁচানো সম্ভব।

প্রযুক্তির দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, আগাম সতর্কবার্তা পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত ইতিমধ্যেই প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দেশের ১৯টিরও বেশি আঞ্চলিক ভাষায় ১৩ হাজার ৪০০ কোটির বেশি এসএমএস অ্যালার্ট পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে সেল-ব্রডকাস্ট ওয়ার্নিং সিস্টেমের পরিধিও ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই পূর্বাভাসগুলোকে সঠিক সময়ে এবং নিখুঁতভাবে কাজে লাগানো। কৃষকরা কখন পাকা ফসল কাটবেন, গভীর সমুদ্রে যাওয়া মাছ ধরার ট্রলারগুলো কখন নিরাপদে উপকূলে ফিরে আসবে, কিংবা আপৎকালীন কুলিং সেন্টারগুলো কবে সচল করা হবে—এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো যদি সময়মতো নেওয়া যায়, তবে পরিস্থিতি বিপর্যয়ের রূপ নেওয়ার আগেই অনেক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

ভবিষ্যতের জলবায়ুর কথা মাথায় রেখে পরিকাঠামো গড়ে তোলাও বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান শর্ত। পুরনো বা গতানুগতিক নিয়মে তৈরি রাস্তাঘাট, জলের বাঁধ, বিদ্যুতের লাইন কিংবা বহুতল বাড়িগুলো আগামী দিনে চরম আবহাওয়ার মুখে পড়লে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভারতের ‘কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ (CDRI) এই জলবায়ু-সহনশীল টেকসই উন্নয়নের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনাগুলো সর্বদাই স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া উচিত। ওড়িশা উপকূলের ঘূর্ণিঝড়, হিমালয়ের মেঘভাঙা বৃষ্টি, ব্রহ্মপুত্রের তীব্র বন্যা, উত্তরের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ কিংবা মধ্য ভারতের দাবানল—প্রতিটির মোকাবিলা কৌশল আলাদা হওয়া প্রয়োজন। তাই গোটা দেশের জন্য একটিমাত্র ছক না কষে, স্থানীয় বিপদের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে জেলা স্তরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করাটা অনেক বেশি ফলপ্রদ।

এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণও সমানভাবে জরুরি। ১৯৯৯ সালের ওড়িশা সাইক্লোনের পরের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, কেন্দ্রাপড়া জেলার বহু এলাকায় প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ জঙ্গল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বিপর্যয় আরও মারাত্মক রূপ নিয়েছিল। অথচ ম্যানগ্রোভ, জলাভূমি, বনাঞ্চল কিংবা চারণভূমির মতো প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রগুলো অতিরিক্ত বন্যার জল সহজেই শুষে নিতে পারে, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং যেকোনো দুর্যোগের প্রাথমিক ধাক্কা নিজেরা সামলে নেয়। তাই এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে রক্ষা করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিকভাবে সাহায্য করাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী কৌশল। সঠিক প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারত ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে তারা মানুষের জীবন বাঁচাতে সক্ষম। তবে দুর্যোগ মোকাবিলার এই যাত্রায় এখন পরবর্তী ধাপে এসে এটাই সুনিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ শুধুমাত্র দুর্যোগের কবল থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরা ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং চারপাশের সবুজ পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *