হ্যাক করা হলো শত শত সুপারমার্কেটের ফ্রিজ! রাতারাতি ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তাপমাত্রা পৌঁছতেই পুড়ে খাক কোটি কোটি টাকার খাবার!

সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা মাসের (Cybersecurity Awareness Month) শুরুতেই বিশ্বজুড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিল এক নজিরবিহীন ও ভয়ঙ্কর সাইবার হামলা। কোনো ওয়েবসাইট হ্যাক বা সাধারণ ডিজিটাল তথ্য চুরি নয়, এবার সরাসরি ভৌত বা ফিজিক্যাল পরিকাঠামোয় থাবা বসাল হ্যাকাররা। ফ্রান্সে প্রায় শ’য়ে শ’য়ে সুপারমার্কেটের কনেক্টেড রেফ্রিজারেশন সিস্টেম দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে রাতারাতি খাবার নষ্ট এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো মারাত্মক ঘটনা ঘটিয়েছে সাইবার অপরাধীরা।

কী ঘটেছিল ১১ ও ১২ অক্টোবরের রাতে?
প্যারিস প্রসিকিউটরের দপ্তর এবং ফরাসি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ANSSI-এর যৌথ তদন্ত রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। গত ১১ ও ১২ অক্টোবরের রাতে হ্যাকাররা ইন্টারমার্শে (Intermarché), ক্যারফুর (Carrefour), মনোপোট্রিক্স (Monoprix) এবং কোঅপারেটিভ ইউ (Coopérative U)-এর মতো প্রথমসারির সুপারমার্কেট চেইনের রেফ্রিজারেশন বা কোল্ড স্টোরেজ সিস্টেম হ্যাক করে। ‘ডিফ্রস্ট সাইকেল’ ম্যানিপুলেট করে ফ্রিজের তাপমাত্রা রাতারাতি বাড়িয়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (50°C) পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়! এর ফলে ফ্রিজে রাখা তাজা ও হিমায়িত সমস্ত খাবার মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যায়। কোল্ড চেইন ভেঙে যাওয়ার পর দোকানগুলো বিপুল পরিমাণ খাবার ফেলে দিতে বাধ্য হয়, যার ফলে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী কোটি কোটি ইউরোর (Tens of millions of Euros) ক্ষতি হয়েছে।

ফ্রিজের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে হ্যাকারদের হাতে গেল?
তদন্তে জানা গেছে, ডেনমার্কের বিখ্যাত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ড্যানফস’ (Danfoss)-এর রিমোটলি পরিচালিত রেফ্রিজারেশন ইকুইপমেন্টকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। সাধারণ অবস্থায় যে যন্ত্র খাবার ঠাণ্ডা রাখার কথা, সেই যন্ত্রকেই হ্যাকাররা তাপ উৎপাদক যন্ত্রে পরিণত করে। ড্যানফস জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রগুলির বেশিরভাগই ছিল বেশ পুরোনো মডেলের, যেগুলিতে সাম্প্রতিক কোনো সফটওয়্যার বা সিকিউরিটি আপডেট দেওয়া ছিল না।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্বে প্রকাশিত কমান্ড-ইনজেকশন ত্রুটি এবং অলক্ষিত থাকা সিকিউরিটি দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে ফরাসি সাইবার হামলাটির সম্পূর্ণ কারিগরি রোডম্যাপ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি তদন্তকারীরা।

কেন এই সাইবার হামলা বিশ্বজোড়া উদ্বেগের বিষয়?
এটি কেবল কোনো সাধারণ ডিডোস (DDoS) বা ওয়েবসাইট অচল করে দেওয়ার ঘটনা নয়। এই হামলায় সরাসরি বাস্তবে থাকা ভৌত যন্ত্রপাতির তাপমাত্রা পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি সরাসরি অগ্নিঝুঁকি (Fire risk) তৈরি করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল হলে বাস্তব জগতের বিশাল অর্থনৈতিক ও জীবনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

বর্তমানে এই ঘটনার পেছনে কার হাত রয়েছে বা তাদের আসল উদ্দেশ্য কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ফ্রান্সের মতো দেশে ঘটা এই হাই-টেক সাইবার হামলা ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সুপারমার্কেট ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোল্ড স্টোরেজ সিস্টেম পরিচালনাকারীদের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *