ডলারের দাম ছুঁলো রেকর্ড ৯৬.৭৮ টাকা! রুপিকে চরম বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের

মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার (INR) রেকর্ড পতন ঠেকাতে অবশেষে সরাসরি বাজারে হস্তক্ষেপ করল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের অনিশ্চয়তা, ক্রমাগত বিদেশী পুঁজির বহির্গমন এবং ডলারের শক্তিবৃদ্ধির জেরে ঐতিহাসিক পতনের মুখে পড়েছে রুপি। বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য ৯৬.৭৮ টাকায় এসে ঠেকেছে, যা এর আগে মে মাসে হওয়া সর্বকালের সর্বনিম্ন ৯৬.৯৫ টাকার রেকর্ড স্পর্শ করার খুব কাছাকাছি। এই চরম অস্থিরতা ও বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অনৈতিক ফটকাবাজি (Speculation) রুখতে ডেরিভেটিভস বাজার এবং ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর একগুচ্ছ কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।

আরবিআই-এর কড়া পদক্ষেপ ও বিধিনিষেধ:
শনিবার জারি করা নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, রুপির দর ধরে রাখতে ফরেক্স ডেরিভেটিভস নিয়মে বড়সড় পরিবর্তন আনা হয়েছে:

চুক্তি পুনঃবুকিংয়ে নিষেধাজ্ঞা: কোনো নিবন্ধিত ডিলারের কাছে একবার বৈদেশিক মুদ্রা ডেরিভেটিভ চুক্তি বাতিল হলে, তা আর নতুন করে পুনঃবুক (Re-book) করা যাবে না। তবে মেয়াদ শেষে চুক্তি রোলওভারের সুবিধা বহাল থাকবে।

লেনদেনের সীমায় বড় ছাঁটাই: কোনো অন্তর্নিহিত এক্সপোজার প্রতিষ্ঠা না করেই চুক্তি হেজ করার সীমা ১০০ মিলিয়ন ডলার থেকে একধাক্কায় কমিয়ে মাত্র ৫ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রেও ওভার-দ্য-কাউন্টার পজিশনের এই সীমা সমপরিমাণ কমানো হয়েছে।

২০% নগদ রিজার্ভ রাখার বাধ্যবাধকতা:
বাজারের ঝুঁকি কমাতে ২০ লক্ষ ডলারের বেশি মূল্যের রুপি-সংযুক্ত ডেরিভেটিভ চুক্তির জন্য ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ রিস্ক রিজার্ভ’ (FERR) চালু করেছে আরবিআই। এই নতুন নিয়মের অধীনে নিবন্ধিত ডিলারদের প্রতিটি যোগ্য লেনদেনের আনুমানিক মূল্যের ২০ শতাংশ অর্থ আরবিআই-এর কাছে নগদ রিজার্ভ বা ক্যাশ হিসেবে জমা রাখতে হবে। এটি মূলত কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ঝুঁকি কমানোর লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

তেল সংস্থাগুলির জন্য বিশেষ সিদ্ধান্ত ও নথিপত্রের নজরদারি:
বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের ওপর থেকে ডলারের অতিরিক্ত চাপ কমাতে আগামী ১২ই অক্টোবর থেকে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (IOCL), ভারত পেট্রোলিয়াম (BPCL) এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম (HPCL)-এর সম্পূর্ণ দৈনিক ডলারের চাহিদা সরাসরি মেটাবে আরবিআই। এর ফলে সাধারণ ফরেক্স বাজার থেকে এই তিন রাষ্ট্রীয় তেল বিপণনকারী সংস্থার ডলার কেনার চাপ পুরোপুরি দূর হবে। এছাড়া, একই ঝুঁকি অন্য কোনো ডিলারের মাধ্যমে হেজ করা হয়নি তা সুনিশ্চিত করতে গ্রাহকদের থেকে লিখিত অঙ্গীকারপত্র জমা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার ভাঁড়ারে বড় পতন:
এদিকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২ই অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১২.৯৫ বিলিয়ন ডলার কমে ৭৩৪.৬০ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি পরপর চতুর্থ সপ্তাহের মতো পতন। গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর ভারতের ফরেক্স রিজার্ভ রেকর্ড ৭৮৫.৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, সেখান থেকে মাত্র এক মাসে প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই কঠিন সময়ে রুপির দর ধরে রাখতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকরী হয়, সেদিকেই নজর রাখছেন আর্থিক বিশেষজ্ঞ ও ট্রেডাররা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *