জাহাজ খালি ফেরে ৪০% সময়ই! বিশ্ব বাণিজ্যের এই লুকোনো রক্তক্ষরণ কীভাবে ডেকে আনছে চরম মহার্ঘতা?

নতুন মোবাইল ফোন কেনা হোক কিংবা ঘরের আনাজপাতি বা গাড়ির তেল— এই সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ঠিক কীভাবে আমাদের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছায়, তা আমরা খুব কম সময়ই ভেবে দেখি। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, পণ্যবাহী এই বিশাল জাহাজগুলোই হলো বিশ্ব বাণিজ্যের আসল মেরুদণ্ড। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে কারোরই বিশেষ মাথাব্যথা থাকে না, কিন্তু যেইমাত্র একটি জাহাজ বন্দরে আটকে যায়, অমনি গোটা বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে যায় চরম তোলপাড়।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অধ্যাপক মিরতো কালোপসিডি জানিয়েছেন, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্তত ৮০ শতাংশ পণ্যই সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। অথচ অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থেকে গেছে। অধ্যাপক কালোপসিডির গবেষণা বলছে, সামুদ্রিক পণ্য পরিবহনের এই বিশাল ব্যবস্থা একবার বেহাল হয়ে পড়লে তার অভিঘাত যেকোনো শেয়ার বাজারের পতনকেও হার মানাতে পারে। সমুদ্রে সামান্য একটু বিঘ্ন ঘটার অর্থ হলো বিশ্বজুড়ে এক বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতির সংকট ডেকে আনা।

বন্দরের দীর্ঘ জ্যাম ও বিশ্ব বাণিজ্যের শৃঙ্খল:
সামুদ্রিক বাণিজ্যকে মূলত একটি ব্যস্ত সুপারমার্কেটের বিলিং কাউন্টারের সঙ্গে তুলনা করা চলে। যখন হঠাৎ করে প্রচুর ক্রেতা ভিড় জমান, তখন কাউন্টারের সারি দ্রুত দীর্ঘ হতে শুরু করে। ঠিক একই ঘটনা ঘটে বন্দরগুলিতেও।

এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি ধাপ থাকে। প্রথমে রপ্তানিকারককে জাহাজ খুঁজতে হয়, এরপর পণ্য বোঝাই হয়ে তা নির্দিষ্ট বন্দরে এসে পৌঁছায়। প্রতিটি বন্দরেরই একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা এবং সীমিত সংখ্যক ক্রেন ও কর্মী থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে জাহাজের সংখ্যা বেড়ে গেলেই দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়। লোহিত সাগরের বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা অপরিশোধিত তেল ও শস্য সরবরাহে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। সুয়েজ খালের সংক্ষিপ্ত পথ ছেড়ে জাহাজগুলিকে আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ হয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। ফলে সময় ও খরচ— উভয়ই বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জাহাজ কেন ৪০% সময় খালি ঘোরে?
সামুদ্রিক বাণিজ্যের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর সত্য হলো, এই বিশালাকার জাহাজগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশ সময়ই সম্পূর্ণ খালি অবস্থায় চলাচল করতে হয়। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং (AIS ডেটা) ভিত্তিক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্যের ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা। উদাহরণস্বরূপ, চীন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া জাহাজগুলি ইলেকট্রনিক্স ও পোশাকে ঠাসা থাকে, কিন্তু ফেরার সময় সেগুলিকে প্রায় খালিই ফিরে আসতে হয়। কাঁচামালের ক্ষেত্রেও ভারত ও চীনের মতো দেশগুলি অস্ট্রেলিয়া বা ব্রাজিল থেকে কয়লা এবং লৌহ আকরিক আমদানি করার পর জাহাজগুলিকে খালি হাতেই অন্য বন্দরে ফিরে যেতে হয়।

এশিয়ার ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ও জলবায়ুর চ্যালেঞ্জ:
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় ব্রিটেন বা ইউরোপের হাতে এই শিল্পের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়া এর দখল নেয়। আর বর্তমান যুগে শক্তিশালী সরকারি নীতির ওপর ভর করে চীন এই শিল্পের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে ইউরোপ এই শিল্প থেকে কার্যত হারিয়ে যাবে এবং ভারতের বাজার অংশও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পাশাপাশি, জলবায়ুর পরিবর্তনশীল রূপ এবং ঘন ঘন সামুদ্রিক ঝড়ও এখন বাণিজ্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানামা খালে তীব্র খরা কিংবা ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা— সব মিলিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য আজ এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যতক্ষণ না এই জটিল নেটওয়ার্কের দুর্বলতাগুলি পুরোপুরি কাটানো যাচ্ছে, ততক্ষণ বিশ্বকে আকস্মিক মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা থেকে রক্ষা করা এক প্রকার অসম্ভব বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *