মোবাইলের পাসওয়ার্ডে লিখে রেখেছিলেন ‘২০২৬’! বিহারের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের অবিশ্বাস্য গল্প

বড় স্বপ্ন দেখতে এবং সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে সবসময় কোনো বিলাসবহুল একাডেমি বা মেট্রো শহরের জাঁকজমকের প্রয়োজন হয় না— তার প্রমাণ দিলেন বিহারের সারণ জেলার কাজিপুর গ্রামের ছেলে ববি কুমার। সম্প্রতি জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমস ২০২৬-এর পুরুষদের সেপাক টাকরো (Sepak Takraw) কোয়াড্র্যান্ট ইভেন্টে ভারতীয় দল এক ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে। আর এই পদকজয়ী ভারতীয় দলের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে দেশকে গর্বিত করেছেন ববি কুমার।

‘থ্রি ইডিয়টস’ থেকে জীবনের মোড় ঘোরানো শিক্ষা:
ববির এই সাফল্য অর্জনের যাত্রাটি কোনো সিনেমার কাহিনীর চেয়ে কম কিছু নয়। বলিউডের ব্লকবাস্টার ছবি ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর একটি বিশেষ বার্তা তাঁর চিন্তাভাবনাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। সিনেমাটির সেই শিক্ষাই তাঁকে বুঝিয়েছিল যে, জীবন কেবল অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের ভালো লাগা বা প্যাশনকে খুঁজে বের করে তাকে অনুসরণ করার নামই আসল জীবন। অন্য দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই ববির পরিবারও চেয়েছিল সে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে কোনো সুরক্ষিত পেশা বেছে নিক। কিন্তু ববি নিজের জীবনকে কেবল বইয়ের পাতা আর চার-কামরার অফিসের গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখতে চাননি।

পার্কের কাঁচা মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ:
অন্যান্য ভারতীয় যুবকদের মতো ববিও শুরুতে ক্রিকেটের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তবে ২০১৪-১৫ সালের দিকে তাঁর বড় ভাই সানির অনুপ্রেরণায় তাঁর মনোযোগ সরে যায় কম পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত রোমাঞ্চকর খেলা সেপাক টাকরো-র দিকে। এরপর তিনি পাটনার কঙ্করবাগের একটি স্থানীয় পার্কে অনুশীলন শুরু করেন। কোচ পঙ্কজ কুমার এবং করুণেশ কুমারের সঠিক নির্দেশনায় তিনি এই খেলার মারপ্যাঁচ ও শৃঙ্খলা রপ্ত করেন। পার্কের সেই কাঁচা মাঠে লাগাতার ঘাম ঝরানোর ফলে তাঁর প্রতিভা আরও শাণিত হয়। ২০১৯ সালে তাঁর খেলোয়াড় জীবনে বড় মোড় আসে, যখন তিনি স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAI)-এর বরেলি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সুযোগ পান। সেখান থেকেই তাঁর আন্তর্জাতিক স্তরে খেলার প্রস্তুতি শুরু হয়।

পাসওয়ার্ডে ‘২০২৬’ সেট করেই ব্রোঞ্জ জয়:
সাফল্যের পথ কখনোই সহজ হয় না, ব্যর্থতার তিক্ত স্বাদও এর অঙ্গাঙ্গী জড়িত। গত এশিয়ান গেমসের সময় ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে দল গঠনে বদল আসায় তাঁর নাম বাদ পড়ে যায়। যেকোনো ক্রীড়াবিদের জন্যই এটি ছিল এক চরম হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। কিন্তু ববি ভেঙে না পড়ে এই ধাক্কাকে নিজের জেদ ও শক্তিতে পরিণত করেন। তিনি তখনই নিজের পরবর্তী লক্ষ্য স্থির করে ফেলেন— ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমস। এই স্বপ্নকে মনে সবসময় সজীব রাখতে তিনি তাঁর মোবাইল ও অন্যান্য ডিভাইসের পাসওয়ার্ডে ‘২০২৬’ সেট করে দেন। দীর্ঘ চার বছরের কঠোর পরিশ্রমের সুফল তিনি হাতেনাতে পেলেন। শুধু দলেই জায়গা করে নিলেন না, দেশের হয়ে ব্রোঞ্জ পদকও জিতে নিলেন।

পুলিশের চাকরির ফাঁকে অদম্য লড়াই ও সংবর্ধনা:
বর্তমানে ববি কুমার বিহার পুলিশে সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত। পুলিশ বিভাগের অত্যন্ত কড়া, ক্লান্তিকর ও সময়সাপেক্ষ দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়ার জন্য ফিটনেস বজায় রাখা একপ্রকার অগ্নিপরীক্ষার সমান। কিন্তু নিজের ইচ্ছাশক্তি জোরে তিনি দু’টি দায়িত্বই সমান তালে সামলেছেন। জাপানে তাঁর এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর বিহার সরকার এই লড়াকু ক্রীড়াবিদকে সংবর্ধিত করেছে। বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী/মন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী ববি কুমারকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেন। এই গৌরবময় অনুষ্ঠানে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী শ্রেয়সী সিং, ববির পরিবার এবং তাঁর কোচও উপস্থিত ছিলেন। ববির এই সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে যে, নিষ্ঠা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *