কান্না মানেই কি ডিপ্রেশন নয়? এই মারাত্মক লক্ষণগুলি অবহেলা করলে অজান্তেই বড় বিপদে পড়বেন!

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন বললেই সাধারণত চোখের জল, গভীর দুঃখ বা বিছানা ছেড়ে উঠতে না পারার ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বা চিকিৎসাগত অবসাদ দৈনন্দিন জীবনে অনেক সময় সম্পূর্ণ অন্য রূপ নেয়। এই লক্ষণগুলি প্রচলিত ধারণার সঙ্গে না মেলায় বহু মানুষ মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে বুঝতেও পারেন না যে তাঁরা আসলে এই রোগের শিকার। শারীরিক ক্লান্তি, বার্ধক্য বা আলস্য ভেবে ভুল করে মারাত্মক বিপদের দিকে এগিয়ে যান অনেকে।

মস্তিষ্কের ধীরগতি বা ‘ব্রেন ফগ’:
অবসাদের অন্যতম একটি লক্ষণ হলো মানসিক ধীরগতি, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ব্রেন ফগ’। কোনো সাধারণ ইমেলের উত্তর দিতে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগা, দৈনন্দিন ছোটখাটো কাজ গুছিয়ে উঠতে না পারা বা সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তীব্র আতঙ্কে ভোগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রক অংশ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে নিউরোট্রান্সমিটারের যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার ফলে স্মৃতিশক্তি, ফোকাস এবং মানসিক গতি মারাত্মকভাবে কমে যায়।

অকারণে শারীরিক অস্বস্তি ও ব্যথা:
চিকিৎসকদের মতে, অবসাদের আরেকটি সাধারণ রূপ হলো সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই শরীরে নানা রকম ব্যথা-বেদনা অনুভূত হওয়া। সেরোটোনিন এবং নরপাইনফ্রাইন কেবল মেজাজই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে ব্যথার সংকেত প্রক্রিয়াজাত করবে তাও নির্ধারণ করে। এই রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরের সহ্য ক্ষমতা কমে যায়। অনেকেই প্রায়ই পিঠের নিচের অংশে দীর্ঘস্থায়ী শক্ত ভাব, টেনশন হেডেক, পেশিতে টান বা পেটের গোলযোগ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান। অথচ রক্ত পরীক্ষা বা অন্যান্য রিপোর্টে কোনো রোগ ধরা পড়ে না, যার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই মানসিক ব্যাধি।

বিরক্তি এবং ভালোলাগার অনুভূতি হারিয়ে যাওয়া:
অবসাদ অনেক সময় দুঃখের বদলে চরম বিরক্তি বা মেজাজ হারানোর মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পায়। সামান্য কারণেই বিরক্ত হওয়া, সহকর্মীদের ওপর হঠাৎ রেগে যাওয়া বা ছোটখাটো ঘটনায় বিস্ফোরণ ঘটার অর্থ হলো স্নায়ুতন্ত্র আবেগ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। এর পাশাপাশি আসে ‘অ্যানহেডোনিয়া’ (Anhedonia)— অর্থাৎ একসময়ে যে শখ বা কাজ আনন্দ দিত, তার প্রতি চিরতরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা। মানুষ হয়তো ওপর ওপর রুটিন মাফিক কাজ করে যান, কিন্তু তার ভেতরে আনন্দের বা তৃপ্তির লেশমাত্র থাকে না।

ঘুমের ব্যাঘাত:
ঘুমের সমস্যাও অবসাদের একটি বড় লক্ষণ। রাত বা ভোর ৩টে বা ৪টে নাগাদ মনকে হাজারও চিন্তায় সজাগ রেখে ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং আর ঘুম না আসা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের অত্যন্ত পরিচিত একটি লক্ষণ। আবার ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর পরেও প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে ঘুম ভাঙাও একই ইঙ্গিত দেয়।

ডিপ্রেশন কোনো মানসিক দুর্বলতা নয়, এটি একটি জটিল শারীরিক রোগ। তাই কাজ, সম্পর্ক ও স্বাস্থ্যের চিরস্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আগেই এই নীরব শারীরিক ও মানসিক সংকেতগুলি চিনে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *