মহালয়ার ভোরে তর্পণে নামার আগে জানুন এই বড় নির্দেশিকা! প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপে সুরক্ষিত কি আপনার ঘাট?

রাত পোহালেই মহালয়া। পিতৃপক্ষের বিদায় আর আলোয় ভরা দেবীপক্ষের আগমনের এক পরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রাজ্যবাসী। আগামীকাল, অর্থাৎ শনিবার (১০ অক্টোবর) ভোরবেলা থেকেই গঙ্গা সহ রাজ্যের বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ করতে ভিড় জমাবেন অগণিত পুণ্যার্থী। সাধারণ মানুষের এই তর্পণ পর্ব যাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে এবার আগেভাগেই কড়া পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। নবান্নের তরফে রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে এক বিস্তারিত নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে।

নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হচ্ছে গঙ্গার ঘাটগুলি:
নবান্নের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি ঘাটের সার্বিক তদারকির দায়িত্বে থাকবেন একজন করে নোডাল অফিসার। বিশেষ করে কলকাতা ও হাওড়া পুরসভাকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কমিশনারেটের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় রেখে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার বিন্দুমাত্র ফাঁক রাখতে নারাজ প্রশাসন।

আগামীকাল ভোর ৩টে থেকেই প্রতিটি বড় ঘাটে ডুবুরি, লাইফ জ্যাকেট, বয়া ও উদ্ধারকারী সরঞ্জাম-সহ স্পিডবোট প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা, পরিবহণ, দমকল এবং পুলিশ দফতরকে। জলের নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ভাসমান ব্যারিকেড ও দড়ি দিয়ে একটি নিরাপদ জোন বা সীমারেখা তৈরি করা হবে। যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে গভীর জলের অংশটি পুরোপুরি ঘিরে রাখা হবে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলিতে রাজ্য ও জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ এবং এনডিআরএফ)-কে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পুণ্যার্থীদের সতর্ক করতে ঘাটে ঘাটে সাইনবোর্ড ও মাইকে লাগাতার প্রচারের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া ঘাটের সিঁড়িগুলি যাতে পিছল না থাকে বা কাঠামোগত কোনো ত্রুটি না থাকে, তা আগেই খতিয়ে দেখেছে প্রশাসন।

মহিলাদের সুরক্ষা ও নাগরিক পরিষেবা:
পুণ্যার্থীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে মহিলাদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বড় ঘাটে পর্যাপ্ত আলো ও জলের ব্যবস্থাযুক্ত আলাদা পোশাক পরিবর্তনের জায়গা এবং বায়ো-টয়লেট রাখা হচ্ছে, যেখানে পাহারায় থাকবেন মহিলা পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবিকারা। অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে ঘাটগুলিতে ঢোকা ও বেরোনোর পথে ব্যারিকেড দিয়ে একমুখী চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন থাকবে পর্যাপ্ত পুলিশ বাহিনী।

পরিচ্ছন্নতা ও জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা:
নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার ওপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঘাটগুলির কাদা, জমে থাকা আবর্জনা, ফুল ও কচুরিপানা পরিষ্কার করে ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক ছড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজ সন্ধ্যা থেকেই তর্পণ শেষ হওয়া পর্যন্ত সাফাইকর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে শিফটে কাজ করবেন। পাশাপাশি, ভোর ৩টে থেকে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করবে সিইএসসি এবং রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন নিগম। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর ও পুরসভাগুলির পক্ষ থেকে অস্থায়ী কিয়স্ক ও জলের ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে পরিস্রুত পানীয় জলের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য ঘাটে থাকবে ফার্স্ট-এইড ক্যাম্প ও অ্যাম্বুল্যান্স, এবং কাছাকাছি হাসপাতালগুলিকেও বিশেষ সতর্কবার্তায় রাখা হয়েছে।

আজ সন্ধ্যা থেকে তর্পণ পর্ব সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত জেলাগুলির পাশাপাশি নবান্নের স্টেট এমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারে বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু থাকবে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর অবিলম্বে জেলাগুলিকে এই কন্ট্রোল রুমে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ত্রুটি না থাকে, তার জন্য জেলাশাসক এবং কলকাতা পুরসভার কমিশনারকে ব্যক্তিগতভাবে নজরদারি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যসচিব। সবমিলিয়ে, পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের শুরুতে রাজ্যবাসীর তর্পণ যাতে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ হয়, তার জন্য এবার আটঘাট বেঁধেই ময়দানে নেমেছে প্রশাসন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *