ইছামতির বুকে দুর্নীতি আর জলের দরে জমি বিলি! টাকি পুরসভার পাহাড়প্রমাণ কেলেঙ্কারিতে সোজা নজরদারি আদালতের

টাকি পুরসভার পাহাড়প্রমাণ আর্থিক দুর্নীতি মামলায় অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ করল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতের সরাসরি নজরদারিতে সিআইডি (CID) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে এবং বিচারপতি ওম নারায়ণ রাইয়ের ডিভিশন বেঞ্চ। একই সঙ্গে এই চাঞ্চল্যকর মামলার ‘আদালত বান্ধব’ (Amicus Curiae) হিসেবে আইনজীবী তিলক মিত্রকে নিয়োগ করা হয়েছে। আদালত অবিলম্বে সিআইডিকে টাকি পুরসভা থেকে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও সিল করার নির্দেশ দিয়েছে।

দুর্নীতির সূত্রপাত ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
২০২৩ সালে টাকি পুরসভার তৎকালীন তৃণমূল চেয়ারম্যান সোমনাথ মুখোপাধ্যায় ও তাঁর পরিচালিত পুরবোর্ডের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি এবং স্বজনপোষণের বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছিলেন খোদ তৎকালীন তৃণমূল কাউন্সিলর প্রদ্যুৎ দাস। লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোনো সুরাহা না মেলায় শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে জনগণের স্বার্থে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেন সেই প্রাক্তন কাউন্সিলর।

মামলায় উঠে আসা সুনির্দিষ্ট আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগগুলির মধ্যে অন্যতম হলো—

ভাসমান রেস্তোরাঁ কেলেঙ্কারি: ইছামতির বুকে ভাসমান রেস্তোরাঁ তৈরির নামে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ।

জমি বিলি দুর্নীতি: কোনো বোর্ডের রেজুলেশন ছাড়াই মাত্র ৪২০ টাকা বার্ষিক লিজের বিনিময়ে ‘গোপাল ব্রিগ ফ্রিল্ড’-কে চার বিঘে জমি পাইয়ে দেওয়া।

সস্তা লিজের কারসাজি: ‘সোনার বাংলা’ হোটেলের জন্য মাত্র ১২০ টাকা বাৎসরিক লিজের চুক্তিতে জমি প্রদান।

অবৈধ অ্যাকাউন্ট লেনদেন: তৎকালীন পুরবোর্ডের আমলে প্রবীর চট্টোপাধ্যায় নামে এক লোয়ার ডিভিশন ক্লার্কের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৭২ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা ঢোকার গুরুতর তথ্য।

হাইকোর্টের ভর্ৎসনা ও প্রশ্নচিহ্ন
রাজ্য সরকারের অডিট রিপোর্টে থাকা এই সমস্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। রাজ্যের অন্যান্য পুরসভা ভেঙে দেওয়া হলেও এখনও কীভাবে অভিযুক্ত তৃণমূল পরিচালিত পুরবোর্ড বহাল রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে আদালত। বিচারপতির এজলাসে সরাসরি প্রশ্ন ওঠে, টাকির চেয়ারম্যান কি ‘সর্বশক্তিমান’?

মামলাকারীর আইনজীবী ওমর ফারুক গাজী জানান, ২০১৮ থেকে ২০২২ এবং পরবর্তীতে ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত একটি বিরাট বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি খতিয়ে দেখে আদালত এই রায় দিয়েছে। জনগণের পাবলিক ফান্ড এইভাবে তছরুপ করা সম্পূর্ণ সংবিধান বিরোধী বলে মন্তব্য করেছে উচ্চ আদালত।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত পুরসভার চেয়ারম্যান সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জানান, তিনি এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছু জানেন না এবং আদালতের নির্দেশ হাতে পেলে যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানাবেন। আগামী ১০ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখে মামলার পরবর্তী শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে আদালতে রিপোর্ট পেশ করবেন। জনগণের করের টাকা নয়ছয় হওয়ার ঘটনায় আদালতের এই কড়া পদক্ষেপে এখন তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *