পুকুরের শ্যাওলা থেকে নোবেল জয়! চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল জয়ের নেপথ্যে জেএনইউ প্রফেসরের বিস্ফোরক অবদান

২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর যখন গোটা বিশ্বে ‘অপটোজেনেটিক্স’ প্রযুক্তি নিয়ে চরম তোলপাড় ও চর্চা শুরু হয়েছে, তখন অনেকেরই অজানা যে এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) এক গবেষণাগারের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র।

আলোক সংবেদনশীল আয়ন চ্যানেল আবিষ্কার এবং জীবকোষে আলোর মাধ্যমে নিউরন নিয়ন্ত্রণের বৈপ্লবিক আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর যৌথভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী—কার্ল ডাইসেরোথ, পিটার হেগেম্যান এবং জর্জ নাগেল। আর এই অর্জনের বিশ্বজোড়া আনন্দের মাঝেই ভারতীয় বিজ্ঞান মহলেও দেখা দিয়েছে এক নতুন আশার আলো।

জেএনইউ থেকে জার্মানি: নোবেল জয়ের নেপথ্যে ভারতীয় বিজ্ঞানী
১৯৩০ সালে স্যার সি ভি রমনের পদার্থবিদ্যায় নোবেল জয়ের পর বিজ্ঞানের মূল শাখায় ভারতের দীর্ঘ নোবেল খরা আজও গবেষণাজগতকে ভাবিয়ে তোলে। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে জেএনইউ-এর স্কুল অব বায়োটেকনোলজির অধ্যাপক সুনীল কাটেরিয়ার নাম।

২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে নোবেলজয়ী পিটার হেগেম্যানের অধীনে সরাসরি পিএইচডি গবেষক হিসেবে কাজ করেছিলেন সুনীল কাটেরিয়া। যে মৌলিক আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে আজকের বিশ্বখ্যাত ‘অপটোজেনেটিক্স’ দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণে কাটেরিয়ার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

পুকুরের শ্যাওলা থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিপ্লব
গল্পটার শুরু হয়েছিল অতি সাধারণ এক এককোষী সবুজ শ্যাওলা ‘ক্ল্যামাইডোমোনাস’-কে ঘিরে, যা সচরাচর আমাদের আশপাশের পুকুরের জলেও ভেসে বেড়াতে দেখা যায়। ক্ষুদ্র এই শৈবালটি কীভাবে আলোর অনুভূতি পায় এবং সূর্যের আলোর দিকে সাঁতরে এগিয়ে যায়—এমনই এক সাধারণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে হেগেম্যানের ল্যাবে কাজ শুরু করেন তরুণ ভারতীয় গবেষক সুনীল।

গবেষণার একপর্যায়ে তিনি ওই শ্যাওলার জিনোম থেকে দুটি বিশেষ ডিএনএ সিকোয়েন্স শনাক্ত করতে সক্ষম হন, যা আলোক সংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি করছিল। এই প্রোটিনগুলোই আলো পড়লে কোষে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করতে পারে। পরবর্তীতে ২০০২ ও ২০০৩ সালের যেসব আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধের ওপর ভিত্তি করে অপটোজেনেটিক্সের ভিত তৈরি হয়েছিল, তার দুটিতেই সহ-লেখক হিসেবে নাম ছিল সুনীল কাটেরিয়ার।

পরবর্তীকালে এই প্রোটিন মস্তিষ্কের কোষে স্থাপন করে আলোর ঝলকানিতে স্নায়ুকোষ চালু বা বন্ধ করার প্রযুক্তি তৈরি হয়, যা আজ স্নায়ুবিজ্ঞানীদের কাছে স্মৃতি, আবেগ, ঘুম কিংবা স্নায়ুর জটিল অসুখ বোঝার এক অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

“বিজ্ঞানের পথচলা কারও একার নয়, এটি যৌথ সাধনা”
নিজের শিক্ষকের এই ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক সাফল্যে আনন্দিত ও আপ্লুত অধ্যাপক কাটেরিয়া। তবে এই কৃতিত্বের ভাগ নিয়ে তাঁর মধ্যে নেই কোনো অহংকার বা আক্ষেপ। উত্তরপ্রদেশের কনৌজের সাধারণ স্কুল থেকে পড়াশোনা শুরু করে কানপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বিএইচইউ, জেএনইউ হয়ে জার্মানি ও কলম্বিয়ার মতো বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানো এই ভারতীয় বিজ্ঞানী অত্যন্ত বিনম্র।

তিনি মনে করেন, বিজ্ঞানের এই দীর্ঘ সফর কারও একক অর্জন নয়, বরং এক যৌথ সাধনা। শিক্ষক হেগেম্যানের সঙ্গে পিএইচডি শেষের দুই দশক পরও তাঁর স্নেহের সম্পর্ক অটুট রয়েছে এবং তাঁরা একসঙ্গে ২৫টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।

ভারতীয় বিজ্ঞানীদের জন্য বড় বার্তা
বর্তমানে জেএনইউ-এর নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে অপটোজেনেটিক্স ও শ্যাওলার নতুন ব্যবহার নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত অধ্যাপক সুনীল কাটেরিয়া। তাঁর মতে, এই নোবেল জয় ভারতের গবেষণাজগতের জন্য এক মস্ত বড় বার্তা।

পুকুরের শ্যাওলা আলোর দিকে কেন এগোয়—এমন আপাতদৃষ্টে সহজ এক কৌতূহলই যে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় নোবেলজয়ী বিপ্লব ডেকে আনতে পারে, সেটাই প্রমাণ করে যে ভারতে মৌলিক বিজ্ঞানের চর্চা কতটা জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *