সস্তা মিষ্টির রুপোর কাজে লুকিয়ে বিষ? উৎসবের মরশুমে জবলপুরের এই ভীতিজনক তথ্য না জানলে বড় বিপদে পড়বেন

উৎসবের মরশুম মানেই ঘরোয়া আড্ডা আর মিষ্টিমুখ। দোকানে সারি দিয়ে সাজানো পেড়া, বরফি কিংবা কাজু বরফির ওপর চকচকে রুপোর তবক বা ওয়ার্ক দেখলে জিভে জল আসে না, এমন মানুষ পাওয়া ভার। ক্রেতারা সাধারণত এই চকচকে রুপোর কাজ দেখে মিষ্টির মান ও বিশুদ্ধতা বিচার করেন। কিন্তু প্রতি কেজি ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হওয়া সস্তা মিষ্টির গায়ে যদি আড়াই লক্ষ টাকা কেজি দরের রুপোর তবক লাগানো থাকে, তবে তা নিশ্চয়ই বড়সড় কোনো প্রশ্নের জন্ম দেয়! আর ঠিক এই রহস্যের জট কাটাতেই এবার আসরে নেমেছে খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ।
ব্যাপক হারে খোয়া সরবরাহ ও মিষ্টি উৎপাদন
জবলপুর জেলার চরগাওয়ান, শাহপুরা, বেলখেড়া, কুন্দম, পাটন, কাটঙ্গি এবং সেহোরা এলাকায় গ্রামীণ মারফত প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কুইন্টাল খোয়া বা ক্ষীর শহরে সরবরাহ করা হয়। এই কাঁচামাল দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ কেজি মিষ্টি তৈরি হয়। যার মধ্যে শুধুমাত্র পেড়া ও বরফি তৈরিতেই প্রায় ৫,০০০ কেজি খোয়া ব্যবহৃত হয়। আর এই উৎপাদিত মিষ্টির প্রায় ৫০ শতাংশই সাজানো হয় রুপোর কাজ দিয়ে। উৎসবের সময়ে এই ধরনের সাজানো মিষ্টির চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়।
আসলেই কি খাঁটি রুপো ব্যবহার করা হয়?
সবথেকে বড় প্রশ্ন হলো, যে মিষ্টির দাম প্রতি কেজি মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, তাতে ব্যবহৃত রুপোর প্রতি কেজির দাম প্রায় ২.৫০ লক্ষ টাকা কীভাবে হয়? বিশেষজ্ঞদের মতে, এত কম দামের মিষ্টিতে খাঁটি রুপোর পরিবর্তে অ্যালুমিনিয়াম কিংবা অন্য কোনো সস্তা ধাতুর মারাত্মক ভেজাল থাকার সম্ভাবনা প্রবল। খালি চোখে দেখে কোনো মিষ্টির গুণমান বা তাতে ভেজাল আছে কি না তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। একমাত্র পরীক্ষাগার বা ল্যাব টেস্টের মাধ্যমেই এর সত্যতা মিলতে পারে।
খাদ্য প্রস্তুতকারক মনীশ বারদকুলের মতে, খাদ্যোপযোগী কাজে সাধারণত ৯৯৯ ফাইন সিলভার বা ৯৯.৯ শতাংশ বিশুদ্ধ রূপা ব্যবহার করা হয়, যার পুরুত্ব ০.২ থেকে ০.৮ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। চুল্লিতে তা গলিয়ে রোলিং মেশিনের মাধ্যমে অতি সূক্ষ্ম চাদরে পরিণত করে এই তবক তৈরি করা হয়। কিন্তু কম দামের মিষ্টিতে সেই মান বজায় থাকে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন।
বাড়িতে কীভাবে শনাক্ত করবেন?
সাধারণত খাঁটি রুপোর কাজ অত্যন্ত পাতলা ও সূক্ষ্ম হয়। যদি তবকটি খুব পুরু, শক্ত বা প্লাস্টিকের মতো মনে হয়, অতিরিক্ত আঠালো হয় কিংবা হাতে ঘষলে ধাতব অবশেষ ফেলে, তবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা উচিত। তবে বিশেষজ্ঞরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড বা আগুন দিয়ে বাড়িতে এই পরীক্ষা করতে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা শারীরিক ক্ষতি হতে পারে।
স্বাস্থ্যের ওপর কতটা মারাত্মক প্রভাব?
খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রুপোর কাজে ক্ষতিকর ভারী ধাতু বা ভেজাল থাকলে তা পেটে তীব্র ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া এবং মারাত্মক হজমের গোলযোগ ঘটাতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের ভেজাল খাবার শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি, লিভার ও শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও অনেক বেশি।
নমুনা পরীক্ষা ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে জবলপুরের খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ মাঠে নেমেছে। খাদ্য সুরক্ষা কর্মকর্তা অমিত গুপ্ত জানিয়েছেন, শহরের বিভিন্ন দোকান থেকে মিষ্টির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে। মিষ্টির গুণমান, খোয়ার বিশুদ্ধতা এবং রুপোর কাজের নামে অন্য কোনো নিষিদ্ধ ধাতু বা কৃত্রিম রঙের ব্যবহার হয়েছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নমুনায় কোনো রকম অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।